পরিবেশ দূষণের সম্মুখীন হচ্ছে বিশ্বের সমস্ত দেশগুলো, প্রভাব পড়ছে মানব স্বাস্থ্যেও - We Talk about Nature spankbang xxnx porncuze porn800.me
Connect with us

Bengali Edition

পরিবেশ দূষণের সম্মুখীন হচ্ছে বিশ্বের সমস্ত দেশগুলো, প্রভাব পড়ছে মানব স্বাস্থ্যেও

Published

on

পরিবেশ দূষণ
Image credit : Pixabay (TheDigitalArtist)
Share This Article

দিম গুহাবাসী মানুষ যখন প্রথম আগুন এবং চাকা বানাতে শিখল তারপর থেকেই জয়যাত্রা শুরু হলো মানব সভ্যতার।  সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথেই মানুষ যেন একটু একটু করে ক্রমাগত দূরে চলে এসেছে প্রকৃতি থেকে। পরিকল্পনাহীন নগর পত্তন, তীব্র ভোগবাদী মানসিকতায় মানব জাতি ধ্বংস করতে থাকে একের পর বন-জঙ্গল। বিষিয়ে উঠতে থাকে জল, বাতাস।  যার ফলশ্রুতি হিসেবে পৃথিবী ব্যাপী সমগ্র দেশেই এখন পরিবেশ দূষণ এবং পরিবেশ সম্পর্কিত সমস্যার মতো এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। 

পরিবেশ বলতে কী বোঝায়?

পরিবেশ বলতে এক কথায় আমরা বুঝি মানুষের আশেপাশে থাকা সমস্ত প্রাণীকূল, জীব বৈচিত্র্য নিয়েই পরিবেশ। আকাশ, বায়ু, জল, বিভিন্ন উদ্ভিদ, প্রাণী বৈচিত্র নিয়েই আমাদের পরিবেশ। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট না করেই পরিবেশ মানব সমাজ এবং অন্যান্য জীবদের লালন করে, বৃদ্ধি করে, ভার বহন করে, বংশবিস্তারে সাহায্য করে, চলন-গমনে সহায়তা করে এবং বেঁচে থাকার জন্য যোগান দেয় উপযুক্ত খাদ্যের। সেই সুদীর্ঘকাল ধরেই বিভিন্ন ধরনের পরিবেশে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী গোষ্ঠী বেঁচে আছে।
 

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের পরিবেশ বিভিন্ন রকমের। জলবায়ু, মাটির বৈচিত্র্য, জীব বৈচিত্র্যও এক একটি জায়গায় এক এক রকম। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, মোঙ্গোলিয়ায় ঊষর এবং রুক্ষ পাহাড় হলে ভারতের নাগাল্যান্ডের পাহাড় ঘাসের মতো নরম বাঁশ গাছে সবুজ। কোথাও নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু হলে কোনো জায়গায় বছরের প্রায় বারোমাসেই বর্ষাকাল থাকে। আর এই রকমারি পরিবেশের ওপরেই নির্ভর করে আছে হরেক রকম প্রাণী ও জীবজন্তুর জীবনযাত্রা।

পরিবেশ দূষণ:- 

গত বেশ কয়েক বছর ধরেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রাণীবিদ এবং প্রকৃতি বৈজ্ঞানিকেরা ক্রমাগত সচেতন এবং সতর্ক করার চেষ্টা করেছেন আমাদের। জানিয়েছেন ভবিষ্যতের নিদারুণ সংকটের কথা। মানব সভ্যতার লোভ, অবিবেচকের মতো কার্যকলাপের ফলে যে ক্রমশ পৃথিবীর পরিবেশ বিষিয়ে উঠছে এবং তার ফলে মানব জীবন তথা উদ্ভিদ এবং সমস্ত প্রাণীজগতের সামনেই দেখা দিয়েছে নিদারুণ সংকট। 

যন্ত্র সভ্যতা, আণবিক এবং পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ, বেআইনি খনিজ সম্পদের নিষ্কাশন, মানুষের অস্বাভাবিক হারে বংশবৃদ্ধি, কারখানার থেকে বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থ অপসারণের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। 

দ্রুত গতিতে বংশ বিস্তারের ফলে বিভিন্ন দেশগুলোর কাছে অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে জনস্ফীতি। ব্যাপক হারে অভাব ঘটছে বসবাসযোগ্য স্থানের। ফলে কাটা পড়ছে একের পর এক বন, পুকুর ভরাট হয়ে গড়ে উঠছে ইমারত। খাদ্যের যোগান দিতে গিয়ে জমিতে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহারের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে হলো। যার ফলাফল জমির স্বাভাবিক উর্বরতা শক্তি কমতে শুরু করেছে। এসি, ফ্রিজের, যানবাহনের অতি ব্যবহারেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে ওজোন স্তর। পরিবেশ দূষণের প্রত্যক্ষ ফলাফল এসে পড়ছে আমাদের শরীর-স্বাস্থ্যের ওপরেও। 

বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শুধুমাত্র বাংলাদেশেই মোট মৃত্যুর প্রায় ২৬% সংখ্যায় ৮০ হাজার মানুষের দূষণের কারণেই মৃত্যু হয়েছে। এশিয়ার অন্যতম দেশ গুলো- ভারতে ২৬.৫%, মালেশিয়াতে ১১.৫%, পাকিস্তানে ২২.২%, আফগানিস্তানে ২০.৬% এবং শ্রীলঙ্কাতে ১৩.৭% মানুষের মৃত্যু হয়েছে দূষণের কারণেই। 

পরিবেশ দূষণ চার রকমের হয়ে থাকে।

ক) বায়ু দূষণ

খ) জল দূষণ 

গ) মৃত্তিকা দূষণ

ঘ) শব্দ দূষণ 

বিশ্বে মোট ৯ মিলিয়ন মৃত্যুর কারণের জন্য দায়ী পরিবেশ দূষণ। বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ১৬%। এইচআইভি এইডস, টিউবারকোওলসিস এবং ম্যালেরিয়াতে মৃত মোট মৃত্যুর থেকে ৩গুণ বেশি এবং প্রায় ১৫% বেশি পৃথিবীব্যাপী সমস্ত যুদ্ধ মৃত সংখ্যা থেকে। 

ক) বায়ু দূষণ:-

যানবাহন, শিল্পোৎপদান কলকারখানার ফলে বাতাসে ক্রমেই বেড়ে চলেছে নানান ক্ষতিকারক উপাদান। বিশ্ব ব্যাংকের ডেটা অনুযায়ী পুরো বিশ্বের জিডিপির প্রায় ৪.৮% অর্থাৎ ৫ .৭ ট্রিলিয়ন ডলার কেবলমাত্র বায়ুদূষণের ফলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৮-২০১৯ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাতাসে ভাসমান পিএম১০ কণার উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে যে পরিসংখ্যান হয়েছিল তাতে প্রথম পাঁচটি শহরের মধ্যে রয়েছে-

১) দিল্লী, ২৯২

২) কায়রো, ২৮৪

৩) ঢাকা, ১৪৩

৪) মুম্বই, ১০৪

৫) বেজিং, ৯২

২০২০ সালে বায়ুদূষণের হারে দিল্লীকে টেক্কা দিয়ে প্রথম স্থান নেয় গাজিয়াবাদ।  দিল্লী এখন পঞ্চম স্থানে। বিশ্বের প্রথম ২০ টি সবচেয়ে দূষিত শহরের মধ্যে ১৪টি শহরই রয়েছে ভারতের। 

বিশ্ব ব্যাংক অনুযায়ী বাতাসে ভাসমান পিএম২.৫ কণার উপস্থিতিতে যে প্রথম পাঁচটি দেশ এগিয়ে আছে-

১) ইউনাটেড আরব এমিরেটস/ ইউএই, ৮০

২) মাউরটেনিয়া, ৬৫

৩) সৌদি আরব, ৬২

৪) লিবিয়া, ৩৭ এবং নিগারেও ৩৭ 

৫) মালি, ৩৪

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত ১০ মাইক্রোগ্রাম পার কিউবিক মিটার থেকে যা অত্যন্ত বেশি। 

 WHO থেকে আরো জানা যায় যে প্রতিবছর প্রায় ৪.২ মিলিয়ন মৃত্যুই হয় কেবল মাত্র বায়ুদূষণের জন্য। 

খ) জল দূষণ:- 

কলকারখানা তরল বর্জ্য পদার্থ, চাষের জমিতে প্রয়োগ করা সার এবং কীটনাশক, শহর এবং গ্রামের নালা নর্দমা, পণ্যবাহী জাহাজের থেকে নির্গত প্লাস্টিক গিয়ে মিশছে জলে। যার ফলে স্বাদু জল এবং লবনাক্ত জল দুই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। WHO এবং ইউনিসেফের মতে  বিশ্বের ২.১ বিলিয়ন মানুষের কাছে পান করার যোগ্য জল নেই। পরিস্রুত স্বাদু জলের সর্বাধিক অভাব রয়েছে এমন ৫ টি দেশ হলো-

১) উগান্ডা 

২) ইউথোপিয়া 

৩) নাইজেরিয়া

৪) কম্বোডিয়া 

৫) নেপাল

২০১৮-২০১৯ সালে বিশ্বের স্বাদু জলের মোট ৭০% শতাংশ চাষবাসের খাতে ব্যবহার হয়। কিন্তু ২০৫০ সালে পৃথিবী ব্যাপী ৫০% চাষাবাদ বৃদ্ধি করার সাথে সাথে ১৫% স্বাদু জলের ব্যবহার কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে। 

স্বাদু জলের একটি বড়ো উৎস হলো নদী। কিন্তু ক্রমাগত প্লাস্টিকজাত বর্জ্য পদার্থ, কেমিক্যাল বর্জ্য পদার্থ, জৈব বর্জ্য পদার্থ ইত্যাদির ফলে নদীগুলো ক্রমে দূষিত হচ্ছে। ২০১৯ সালে পৃথিবীর প্রথম পাঁচটি সর্বাধিক দূষিত নদী হলো-

১) গঙ্গা নদী

২) সিটারাম নদী

৩) ইয়েলো নদী

৪) সারনো নদী 

৫) বুড়িগঙ্গা নদী 

শিল্প কারখানা থেকে নির্গত  নাইট্রোজেন এবং ফসফরাস, এছাড়াও পণ্যবাহী জাহাজের তেলের জন্যেও সমুদ্রের জলের পুষ্টিগত মান তথা অক্সিজেনের অভাব ঘটছে। ফলে টুনা, মার্লিন, হাঙরসহ একাধিক প্রাণী এবং সামুদ্রিক উদ্ভিদের প্রাণ আশংকা রয়েছে। পুরো বিশ্বের সাতশোটিরও বেশি সামুদ্রিক এলাকায় ক্রমাগত অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে, অথচ ১৯৬০ এর দিকে এই সংখ্যা ছিল ৪৫ টি।

গ) মৃত্তিকা দূষণ:-

মাইক্রোপ্লাস্টিক, বেআইনি মাইনিং, রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং আগাছানাশক, কলকারখানার বর্জ্য নির্গমন ইত্যাদির ব্যবহারের ফলে মাটি দূষণ হয়ে থাকে। দূষিত মাটিতে যে সমস্ত পদার্থ খুঁজে পাওয়া যায়-

১) হাইব্রোকার্বন ৪২% 

২) হেভি মেটাল ৩১%

৩) মিনারেল তেল ২০% 

৪) অন্যান্য পর্দাথ ৭%

উত্তর আমেরিকা এবং পশ্চিম ইউরোপের বেশ কিছু দেশে দূষিত মাটির আধিক্য দেখা যায়। কিন্তু এসব দেশগুলোতেও পরিবেশ দূষণ আইন রয়েছে। কিন্তু আর সমস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতোই এই সমস্ত দেশেও পরিবেশ দূষণ বিষয়ক আইনে ছাড় দেওয়া হয়। মৃত্তিকা দূষণের ফলে কিডনি, হার্টের সমস্যা, মাথা ঘোরা এবং বমি বমি ভাবের মতো রোগ হতে পারে মানুষের শরীরে। উদ্ভিদের বিকাশ এই মাটিতে কার্যত অসম্ভব কারণ এই মাটির পুষ্টিগত মান নেই বললেই চলে তাই এই সমস্ত স্থানের উদ্ভিদ স্বল্পায়ু হয়। অজৈব অ্যালুমিনিয়ামের উপস্থিতির উদ্ভিদদের অনুকূলেও নয়। বায়োকিউমিলেশন প্রক্রিয়ায় দূষিত পদার্থ জমিয়ে রাখা উদ্ভিদদের খাদ্য হিসেবে কোনো প্রাণী গ্রহণ করলে তার মৃত্যুও হতে পারে।

ঘ) শব্দ দূষণ:- 

যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে শব্দ দূষণের মাত্রাও।  প্রধানত শহরাঞ্চল, শিল্পাঞ্চলের দিকেই এর তীব্র মাত্রা থাকে। WHO থেকে নির্ধারিত করা হয়েছে ৬৫ ডেসিবেলের অধিকমাত্রার যেকোনো শব্দকেই দূষণ হিসেবে ধরা হবে। 

পৃথিবীর সবচেয়ে শব্দ জনিত দূষিত শহরের মধ্যে প্রথম পাঁচটি হলো-

১) সাংহাই,  চিন

২) নিউ দিল্লী, ভারত

৩) কায়রো, ঈজিপ্ট 

৪) মুম্বাই,  ভারত

৫) ইস্তানবুল, টার্কি

শব্দ দূষণের অন্যতম উৎস গুলোর মধ্যে প্রধান উৎসগুলো হলো-

১) যানবাহনের শব্দ- একটি গাড়ির আওয়াজ ৯০ ডেসিবেল এবং একটি বাস ১০০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ তৈরী করতে পারে। 

২) এয়ারট্রাফিক- সমস্ত শহরে এয়ারট্রাফিক না থাকলেও এর ক্ষতি সাধনের পরিমাণ অনেক বেশি। প্রায় ১৩০ ডেসিবেল শব্দ উৎপাদন করে। 

৩) কনসট্রাকশন সাইট- ইমারত, পার্কিং, রাস্তা এবং ফুটপাথ তৈরির সময়েও শব্দ দূষণ হয়। শুধুমাত্র ড্রিল মেশিন গুলোর তীব্রতা থাকে ১১০ ডেসিবেল। 

দিওয়ালি, নববর্ষ সেলিব্রেশনের সময়ে শব্দবাজি ফাটানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে ভারতে। কানে শোনার সমস্যা, হার্টের অসুখ, মাইগ্রেনের মতো শারীরিক সমস্যা বৃদ্ধি পায় শব্দ দূষণের ফলে। 

বৈঠক:- 

এই বছর চেজ রিপাবলিকের প্রাগে ১০ তম International Conference on Environmental Pollution and Remediation এর বৈঠক হতে চলেছে ১৯ আগস্ট থেকে ২১ আগস্ট।  এবারের বিষয় বস্তুগুলো হলো- 

১) বায়ু দূষণ 

২) জৈব জ্বালানি 

৩) গ্রিন হাউসের প্রভাব এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং

৪) মৃত্তিকা দূষণ 

৫) জল দূষণ 

৬) ভূ-গর্ভস্থ জলের ব্যবহার প্রভৃতি।

উপসংহার:-

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী পৃথিবীর প্রায় ৯১% জীবন সরাসরি পরিবেশ দূষণের কারণে প্রভাবিত হয়। বিলাসী জীবন যাপনের জন্য মানব সভ্যতা ক্রমশ প্রকৃতির রস নিষ্কাশন করে গেছে, যার ফলাফল একের পর এক সাইক্লোন, বন্যার মতো দুর্ঘটনা। ক্ষতিসাধনের যে খেলায় মানুষ মেতেছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। পৃথিবীতে আবার গড়ে তুলতে হবে শ্যামল সুন্দর সবুজের মায়া। পরের প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলার নৈতিক দায় সবাইকেই ভাগ করে নিতে হবে।

আরো পড়ুন!

লেখিকা : পারমিতা চৌধুরী, যাদবপুর, কলকাতা

Bengali Edition

বরন্তিঃ ছবির মতো সাজানো পুরুলিয়ার ছোটো একটি আদিবাসী গ্রাম

Published

on

বরন্তি
Image credit : Wikipedia
Share This Article

বি জীবনানন্দ লিখেছিলেন “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর” । পাহাড়-পর্বত-সমুদ্র-জঙ্গলের আবরণে ভূষিত ভারতের পূর্বাংশের অন্যতম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। বাংলার শঙ্খচিল তাই কেবলমাত্র কবি বা সাহিত্যিকের লেখায় নয়, বিভিন্ন সিনেমার দৃশ্যেও দর্শকের মগজে এবং মননে নিজের রূপে স্বমহিমায় ধরা দিয়েছে। এই রূপের মোহেই পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে ভ্রমণ পিপাসু মানুষের আগমন ঘটেছে এ রাজ্যে। একাত্ম হয়েছেন স্থানীয় মানুষ, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সাথে। আপন করে নিয়েছেন এই স্থানের জল-বায়ু, খাদ্যরীতি এবং উৎসব আয়োজনকে। এ বাংলার বুকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর লাল মাটির দেশ পুরুলিয়া। পুরুলিয়া জেলাতে অবস্থিত বরন্তি।  ছবির মতো সুন্দর জায়গাটি আসলে একটি আদিবাসী গ্রাম। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও বরন্তির শান্ত সমাহিত ভাব এখনো বর্তমান।

আরো পড়ুন : মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ

পুরুলিয়ার ইতিহাসঃ-

পঞ্চ শতকের জৈন ভাগবতী-সূত্র অনুযায়ী পুরুলিয়া ১৬ তম মহাজনপদের মধ্যে অন্যতম ছিল এবং প্রাচীনকালে ভজ্রভূমি নামে এক দেশের অন্তর্গত ছিল। ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বাংলা, বিহার এবং উড়িশ্যার দেওয়ানী লাভের আগে পর্যন্ত পুরুলিয়া নিয়ে সেরকম কিছু জানা যায় না। ১৮০৫ সালে ১৮ তম অধিবেশনে পুরুলিয়া সহ  ২৩ পরগণা নিয়ে জঙ্গল মহল জেলা তৈরি হয়। ১৮৩৩ সালে ১৩ তম অধিবেশনে এই জেলা ভেঙ্গে মানভুম জেলা তৈরি হয়, জেলা সদর দপ্তর থাকে মানবাজারে।

জঙ্গল মহল অঞ্চলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব অধিক থাকার ফলে সমস্ত অঞ্চলটিকে অনেক গুলো ছোটো ছোটো জেলায় ভাগ করে যেমন- পাঞ্চেত [১৭৭৩], জঙ্গল মহল [১৮০৫], মানভূম [১৮৩৩] ।

তবে এই মানভূম জেলাটি আয়তনে অত্যন্ত বড়ো ছিল [প্রায় ৭৮৯৬ স্কোয়ার মাইল], বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ও বর্ধমান; ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ধানবাদ ও ধলভূম এবং উড়িষ্যার সারাইকেলা ও খারস্বান অঞ্চলগুলোও এই জেলার অন্তর্গত ছিল।

১৮৩৮ সালে জেলা সদর দপ্তর পুরুলিয়াতে স্থানান্তর করা হয়। এরপরেই জেলাটিকে নিয়মিত প্রশাসনের শাসন পদ্ধতিতে থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের গভর্নর জেনারেলের নিকটে প্রিন্সিপাল অ্যাসিস্টেন্স নামে এক আধিকারিকের অধীনে নিযুক্ত করা হয়। ১৮৫৪ সালে ২০ তম অধিবেশনে ‘প্রিন্সিপাল এজেন্ট’ কর্মকর্তা পদটি বদল করে ‘ডেপুটি কমিশনার’ নাম করে রাখা হয়।

মানভূম জেলাকে ১৮৪৫, ১৮৪৬, ১৮৭১ আর ১৮৭৯ সালে আবার বিভক্ত করা হয় যার ফলে এর আয়তন কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৪১১২ স্কোয়ার মাইল।

১৯০৫ সালে বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলন শুরু হয়। বাংলার বিভাজন থামে ১৯১১ সালে আর ১৯১২ সালে বিহার-উড়িষ্যার সৃষ্টি হয়। মানভূমকে বিহার-উড়িষ্যা ভুক্ত করা হলে মানভূমে বসবাসকারী বাঙলাভাষীদের মধ্যে নিজের মাতৃভাষা বাংলার ওপর হিন্দী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ করে।

অবশেষে ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুর্ন গঠন অধিনিয়ম এবং বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ [রাজ্য সীমানা হস্তান্তর] অধিনিয়ম ১৯৫৬, অনুযায়ী বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের মাঝে  মানভূম জেলাটি বিভক্ত হয়। ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বরে জন্ম হয় স্বতন্ত্র পুরুলিয়া জেলার।

আরো পড়ুন :ইকো পর্যটন উপভোগের ১০টি কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ প্রেমীদের জন্য!

পুরুলিয়ার ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যঃ-

পুরুলিয়ার ভৌগোলিক আয়তন হল ৬২৫৯ স্কোয়ার কিমি। পৌরসভা আর অপৌরসভা মিলিয়ে শহুরে অঞ্চলের আয়তন হল ৭৯.৩৭ স্কোয়ার কিমি [ মোট এলাকার ১.২৭%] এবং গ্রামীণ অঞ্চল হল ৬১৭৯.৬৩ স্কোয়ার কিমি অঞ্চল। পুরুলিয়া সদর পূর্ব, পুরুলিয়া সদর পশ্চিম এবং রঘুনাথপুর সহ তিনটি প্রাশাসনিক মহকুমা নিয়ে জেলা সদর দপ্তরটি পুরুলিয়াতে রয়েছে।

পুরুলিয়া রুক্ষ ঢেউ খেলানো ছোটো পাহাড় বিস্তৃত পশ্চিম এবং দক্ষিণ অংশে। পুর্বস্থ মালভূমি আর পাহাড়ের কৃষি জলবায়ু এবং ছোটোনাগপুর দক্ষিণ আর পশ্চিমবঙ্গ মালভূমি নিয়ে জেলাটি অবস্থিত। এটি ক্ষরা প্রবণ এলাকা সত্ত্বেও খানিক বৃস্টিপাত হয়ে থাকে। ১১০০-১৫০০ মিমি বৃস্টিপাত সারাবছর ধরে হয়ে থাকে। উচ্চ বাষ্পীভবন এবং নিম্ম বৃষ্টিপাতের কারণে এই জেলাতে একটি প্রায় গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় আবহাওয়া রয়েছে। বর্ষাকালে বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা অনেক বেশি থাকে, প্রায় ৭৫% থেকে ৮০%। গ্রীষ্মকালে এই পরিমাণ এসে দাঁড়ায় ২৫% থেকে ৩০%-এ। শীতকালে সর্ব নিম্ম তাপমাত্রা থাকে ৭ ডিগ্রী এবং গ্রীষ্মকালে থাকে প্রায় ৫০ ডিগ্রী। এই অঞ্চলে প্রায়ই  ভূমিক্ষয় হয়ে থাকে যার ফলে উপত্যকার দিকে প্রচুর পরিমাণে উর্বরা জমি তলিয়ে গেছে। অধিকাংশ অঞ্চল কৃষিকাজ করার অযোগ্য। সাঁওতাল, মুন্ডা, ভুমিজ, বিরহড়, খারিয়া, শবর জাতির আদিবাসিদের বসবাস এই জেলায়।

বরন্তিঃ-

পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরের কাছে বরন্তি হল একটি  ছোটো আদিবাসী গ্রাম। এই গ্রামকে ঘিরেই  গড়ে উঠেছ পুরুলিয়ার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। লাল মাটির রাস্তা, শাল-পিয়ালের জঙ্গল, শীতকালে ফুঁটে থাকা পলাশ ফুল- সব মিলিয়ে অপূর্ব সুন্দর এই উপজাতীয় গ্রাম। একদিকে রয়েছে বিহারিনাথ, অন্যদিকে গড়পঞ্চকোট পাহাড়। রয়েছে ছোটো পাহাড় ঘেরা সুবৃহৎ  বরন্তি লেক, গিয়ে মিশেছে দিগন্তের সাথে। বরন্তি লেকের পোশাকি নাম রামচন্দ্র পুর, একটি বিখ্যাত জলাধার। পর্যটন কেন্দ্র হলেও এখনো আধুনিকতার আঁচড় লাগে নি এই জায়গায়। মাটির বাড়ি, সাঁওতালি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং তাঁদের সরল জীবনযাত্রা বর্তমান।

বরন্তি থেকে কাছেই পাঞ্চেত পাহাড়। পাঞ্চেত পাহাড়ে পাদদেশে অবস্থিত গড়পঞ্চকোট, একটি ঐতিহাসিক স্থান। সুপ্রাচীন মন্দির, দুর্গ আরোও নানা রকমের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এই স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিখ্যাত পঞ্চ রত্ন মন্দিরটিকেও পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। বরন্তি থেকে গড়পঞ্চকোটের দূরত্ব মাত্র ১২ কিমি।

জয়চন্ডী পাহাড়ও একটি অসামান্য পর্যটন কেন্দ্র। পাহাড়ের চূড়োয় রয়েছে চন্ডী মন্দির। রয়েছে সিমাফোর টাওয়ার। টেলিগ্রাম জামানায় এই সিমাফোর টাওয়ারটি বিখ্যাত ছিল। বরন্তি থেকে জয়চন্ডী পাহাড়ের দূরত্ব ২১ কিমি।

শীতকালে বিদেশ থেকে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি এসে ভীড় করে বরন্তিতে। এই স্থানে শীতকাল হল পর্যটনের জন্য শ্রেষ্ঠ সময়। পাহাড় ঘেরা বরন্তি লেকের সামনে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য অসীম সুন্দর প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে।

কি করে যাবেন এবং থাকার জায়গাঃ-

কলকাতা থেকে বরন্তির দূরত্ব ২৩৫ কিমি। গাড়ি নিয়ে ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে প্রথমে আসানসোল থেকে মুরাডি হয়ে বরন্তি যাওয়া যায়।

বরন্তি গ্রামের সবথেকে কাছের রেল স্টেশন হল মুরাডি। মুরাডি থেকে গ্রামের দূরত্ব ৬ কিমি। বরন্তি যাওয়ার জন্য স্টেশনের সামনেই রিক্সা, ট্রেকার থাকে।

বরন্তিতে লেকের কাছেই বিভিন্ন আধুনিক সুব্যবস্থা সম্পন্ন রিসর্ট রয়েছে। অনলাইন বুকিং করার সুবিধে সহ কন্টিনেল্টাল, চাইনিজ, বাঙালী খাবার, স্টেশনে পিক আপ এবং ড্রপ করে দেওয়ার সুবিধে, তাঁবু পিচ করার জায়গা, বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুবিধে রয়েছে। কেউ চাইলে ট্রেকিং এবং রক ক্লাইম্বিং করার গাইডের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয় রিসর্ট থেকেই।

উপসংহারঃ

পুরুলিয়া নিঃসন্দেহেই অনিন্দ্য সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র। আদিবাসী গ্রাম, তাঁদের জীবনযাত্রা, শিল্প, ভাষা প্রভৃতি স্বতন্ত্র। ছৌ নাচ, টুসু পরব বিখ্যাত। রুক্ষ পরিবেশেও রাঢ় বাংলার লাল মাটির রাস্তা যেন আদরের প্রলেপ দিয়ে যায়। গভীর নীল রঙের জলে বরন্তি লেক পরমা সুন্দরী রাজকন্যে হলে শ্বাপদ সংকুল জঙ্গলে ঘেরা পাহাড় হল বরন্তি রাজকন্যের পাহারাদাড়। বরন্তি নদীতে বাঁধ দেওয়ার ফলেই এই লেকের সৃষ্টি। আবার দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলো পড়ে লেকের জলের রঙ এক এক রকম হয়ে থাকে। আদিবাসিদের অনাম্বড়হীন জীবনের ছাপ ধরা পড়ে গ্রামগুলোর বুকে হেঁটে এলেই। ভ্রমণ আমাদের শেখায় হৃদয় দ্বার উন্মুক্ত করতে। সামাজিক ভেদভাগ ভুলে পর্যটকেরা সকলের সাথেই আত্মীয়তার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। পর্যটন আমাদের শেখায়  মানবিকতার ধর্ম।

সমগ্র পুরুলিয়া জুড়ে দর্শনীয় স্থানের সংখ্যা রয়েছে প্রচুর। সরকার থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই সমস্ত স্থানের সঠিক রক্ষণাবেক্ষন করে বিশ্ববাসীর সামনে তা তুলে ধরা প্রয়োজন। গড়পঞ্চকোটের যে সমস্ত প্রত্নতাত্বিক ধংসাবশেষ রয়েছে তার দিকেও সরকারী তরফে নজর দেওয়া উচিত। আমাদের কাছে যে সম্পদ আছে খুব দেরি হওয়ার আগেই তার মর্ম আমাদের বুঝতে হবে।

Get more details: The West Bengal Tourism Development Corporation Limited (WBTDCL).

বি দ্রঃ বর্তমানে দেশের অনেক জায়গাতেই “কোভিড ১৯” এর জন্যে ভ্রমনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই ভ্রমণের আগে সরকারি নির্দেশ ও নিয়মাবলী মেনে চলাটাই বাঞ্চনীয় !

Continue Reading

Bengali Edition

বন্যপ্রানী অভয়ারণ্য : বাংলাদেশের দশটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

Published

on

বন্যপ্রানী অভয়ারণ্য
Image credit : Wikipedia
Share This Article

বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বা Wildlife Sanctuary এক কথায় বনের প্রাণীগুলোর জন্য নিরাপত্তার অপর নাম। নির্দিষ্ট আয়তন জুড়ে যে এলাকায় বন্যপ্রাণীদের নিরাপত্তা, খাদ্যসংস্থান ও প্রজননের জন্য তাদেরকে অবাধ বিচরণের সুযোগ দেওয়া হয় সেটাই ‘বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য’ হিসেবে পরিচিত। দিনে দিনে মানুষ যতো আধুনিক সভ্যতার দিকে এগোচ্ছে ততোই মানুষ প্রকৃতির জন্য হুমকি স্বরূপ বিরাজ করছে, প্রাণী হত্যা থেকে প্রাণী পাচার কোনো জায়গাতেই এখন পিছিয়ে নেই তারা। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে একটা সময় পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুল বিলীন হয়ে যাবে, এতে করে বাস্তুতন্ত্রের যে ভারসাম্য বর্তমানে আছে সেটা আর থাকবে না এবং মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই প্রাণীরক্ষার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে অভয়ারণ্য দূর্দান্ত! 

আসুন জেনে নিই বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ১০টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সম্পর্কে- 

১০. চর কুকড়ি-মুকড়ি 

প্রায় ৪০ হেক্টর আয়তনের এই অভয়ারণ্যটি বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোটো বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। বরিশাল বিভাগের অন্তর্গত ভোলা জেলার একেবারে দক্ষিণ দিকে চরটির অবস্থান, স্থানীয়ভাবে চরটির নাম ‘কুকড়ি-মুকড়ি’। চরটির আরেক নাম “দ্বীপকন্যা”। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় কয়েকশো’ বছর আগে চরটি জেগে ওঠে, ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ একে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। চরটিকে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি হরিণ, লাল কাঁকড়া, বুনো মহিষ, বানর, বনবিড়াল, উদবিড়াল, শেয়াল, বনমোরগসহ আরো নানাপ্রজাতির অতিথি পাখি ও বন্যপ্রাণী রয়েছে। মনজুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য ও পরিবহন ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় এটি অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও দিনে দিনে জনপ্রিয় হচ্ছে।  

৯. চুনতি অভয়ারণ্য 

বাংলাদেশের অন্যতম বড়ো শহর চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে চুনতি অভয়ারণ্য অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় ৭ হাজার ৭৬৪ হেক্টর। প্রচুর টিলা, গভীর ও অগভীর খাদ এবং পাহাড়ী ভূপ্রকৃতি মিলিয়ে এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটির ভূমি যথেষ্ট বৈচিত্র্যময় বটে। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে এশীয় হাতির চলাচল অবাধ করতে এই অভয়ারণ্য করিডোরের মতো কাজ করে। এই বনে প্রায় ১২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ দেখা যায় যার মধ্যে ৪৫ প্রজাতি উঁচু উদ্ভিদের। গর্জন, রাকতান, জাম, উরি আম, চাপালিশ, শিমুল, কড়ই ছাড়াও প্রচুর ভেষজ উদ্ভিদ এই বনের অন্যতম আকর্ষণ। পূর্বে এই অভয়ারণ্যে প্রায় ১৭৮ প্রজাতির জীবজন্তু ও পাখি পাওয়া যেতো যার মধ্যে উভচর, স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, পাখি সবই ছিলো। বর্তমানে দূষণসহ অন্যান্য কারণে এর জীববৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। 


আরো পড়ুন : সীতাকুন্ড :এশিয়ার বৃহত্তম বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক !

৮. দুধ্মুখী অভয়ারণ্য 

বাংলাদেশের দক্ষিণে খুলনা বিভাগের অন্তর্গত বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত অন্যতম দর্শনীয় স্থান দুধমুখী অভয়ারণ্য, এটি মূলত একটি বিস্তৃত জলাভূমি। ২০১২ সালে এলাকাটি অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত হয়। প্রায় ১৭০ হেক্টরের মতো জায়গা নিয়ে অভয়ারণ্যটি অবস্থিত। শকুনের নিরাপদ এলাকা-২ তফসিল অনুসারে এটি শকুনের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে স্বীকৃত। 

 ৭. হাজারিখিল অভয়ারণ্য  

চট্টগ্রাম শহর থেকে উত্তরে রামগড়-সীতাকুন্ড বনাঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত বিস্তীর্ণ হাজারিখিল অভয়ারণ্য। প্রায় ১১৮ হেক্টর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি হাজারো জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। এ অভয়ারণ্যে প্রায় ১২৩ প্রজাতির পাখি, মথুরা, কাঠময়ূর, কাউ ধনেশ ও হুতুম পেঁচা আছে। পাখির বিশাল সংগ্রহের জন্য একে মাঝারি আকারের একটি ‘পক্ষীরাজ্য’ বল্লেও বোধহয় বোধহয় ভুল হবে না। বিশাল বনভূমি ও অনুকূল পরিবেশ থাকায় এই বনে এমন কিছু পাখি পাওয়া যায় যেগুলো কিনা সচরাচর আমরা অন্যান্য কোনো বনাঞ্চলে দেখতে পাই না; এর মধ্যে আছে হুদহুদ, চোখ গেল, নীলকান্ত, বেঘবৌ, আবাবিল। এছাড়াও পরিযায়ী পাখির জন্য এই অভয়ারণ্য একটি সত্যিকার ‘অভয়’! ২০১০ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। 

৬. টেকনাফ গেম রিজার্ভ 

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন একটি অভয়ারণ্য এই টেকনাফ গেম রিজার্ভ, ১৯৮৩ সাল থেকে বন্য হাতির অভয়ারণ্য হিসেবে এটি প্রসিদ্ধ। বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় টেকনাফ উপদ্বীপে এর অবস্থান। প্রায় ১১ হাজার ৬১৫ হেক্টর জায়গাজুড়ে এটি বিস্তৃত। 

বাংলাদেশের মধ্যে সর্বাধিক জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অভয়ারণ্য হিসেবে ধরা হয় টেকনাফ গেম রিজার্ভকে। এই বনে প্রায় ২৯০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৫৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৮৬ প্রজাতির উদ্ভিদ, উভচর ও সরীসৃপ। বাংলাদেশে বসবাস করা বুনো হাতির প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ টেকনাফের এই অভয়ারণ্যে বাস করে। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ কুদুম গুহা বা বাদুড় গুহা। 

৫. সাঙ্গু অভয়ারণ্য 

বান্দরবান জেলার পার্বত্য এলাকাজুড়ে অবস্থিত সাঙ্গু-মাতামুহুরী বনাঞ্চল, এর মধ্যে দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্রোতধারা বয়ে চলেছে সাঙ্গু নদী। লামা উপজেলার ২৩৩১ হেক্টর জমির উপর এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি অবস্থিত। এই অঞ্চলে হাতি, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ভাল্লুকসহ নানা বিরল প্রাণীর বিচরণ দেখা যায়। ২০১০ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ একে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে, এর সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন করে থাকে বন বিভাগের অধীনস্থ লামা বন বিভাগ। শুধুমাত্র বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবেই নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছেও এর যথেষ্ট কদর রয়েছে। 

৪. ফাঁসিয়াখালী অভয়ারণ্য 

২০০৭ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটিকে স্বীকৃতি দেয়। প্রায় ১ হাজার ৩০২ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই অভয়ারণ্যে স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ইকোপার্ক, যা কিনা পরিবেশপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অন্যতম একটি অ্যাডভেঞ্চারের জায়গা। বন প্রকৃতি অনুযায়ী এটি ক্রান্তীয় চিরহরিৎ বন, গর্জন গাছের বুবিশাল ছায়ায় চলতে চলতে দেখা মিলবে বুনো শুয়োর, চিতাবাঘ, শুয়োর ও বুনো হাতির। এছাড়াও এর ঘন বনের মধ্যে দেখা মিলবে বিরল প্রজাতির শুশুক, উলটো লেজ বানরের। 

৩. সোনারচর অভয়ারণ্য 

পটুয়াখালী জেলার রাঙাবালী উপজেলার অন্তর্গত সোনারচর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য দেশীয় পর্যটকের কাছে অন্যতম দর্শনীয় একটি স্থান। প্রায় ২ হাজার ২৬ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই অভয়ারণ্যে একইসাথে সমুদ্রসৈকত ও বনাঞ্চলের হাতছানি পাওয়া যাবে। শকুনের নিরাপদ এলাকা-১ তফসিল অনুযায়ী এটি শকুনের জন্য অভয়ারণ্য হিসেবে বিবেচিত। 

সমুদ্র সৈকতের পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত এখানকার একটি অন্যতম আকর্ষণ, সাথে আছে অজস্র লাল কাঁকড়ার গালিচা! সূর্যের প্রখর রোদ যখন তীরের বালির উপর পড়ে তখন তীরের বালি চমকে একটি সোনালী আভার সৃষ্টি করে, যার কারণে দূর থেকে দেখে মনে হয় এখানে সোনার প্রলেপ দেওয়া। এ কারণেই স্থানীয়রা এই জায়গার নাম দিয়েছে সোনারচর! 

২. রেমা কেলেঙ্গা অভয়ারণ্য 

সুন্দরবনের পর বাংলাদেশের সবচাইতে বড়ো প্রাকৃতিক বনভূমি হচ্ছে রেমা কেলেঙ্গা বনভূমি। সিলেটের হবিগঞ্জে অবস্থিত এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে ভরপুর সমৃদ্ধ ও বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জায়গাব্যাপী বিস্তৃত এই বনভূমি একটি শুকনো ও চিরহরিৎ বন, বাংলাদেশ বন বিভাগ ১৯৮২ সালে এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়। 

১৬৭ প্রজাতির একটি বড়ো পক্ষীবাহিনীর বিচরণ এই রেমা কেলেঙ্গা অভয়ারণ্যে, যার মধ্যে ভীমরাজ, টিয়া, লালমাথা কুচকুচি, বসন্তবৌরি, মাছরাঙ্গা, সিপাহি বুলবুল অন্যতম। এছাড়াও আছে প্রায় ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্ম। 

১. সুন্দরবন 

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ধরা হয় সুন্দরবনের দক্ষিণ অংশকে। সুন্দরবনের প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জায়গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃত, ব্যাপক প্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সুন্দরবনকে বাকি সবগুলো অভয়ারণ্য থেকে মৌলিক একটি পরিচয় দিয়েছে। এ বনে প্রায় ৫০০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে যা কিনা সারাবিশ্বের মধ্যে এখানেই পাওয়া যায়। এছাড়াও আছে ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি। বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ সরীসৃপ, ৩৭ শতাংশ পাখি ও ৩৭ শতাংশ স্তন্যপায়ী এই সুন্দরবনেই বসবাস করে। বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি। 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হওয়ার সাথে সাথে বনাঞ্চলগুলো ব্যাপকভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণী বৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে পরম মমতায়, যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যগুলো। পর্যটক ও অধিবাসী সকলেরই উচিৎ এই এলাকাগুলোকে যথাযোগ্য মর্যাদায় সংরক্ষণ করা। কারণ ঝড়-তুফানে এই এলাকাগুলো যেভাবে ঢাল হয়ে দেশকে রক্ষা করে তেমনিভাবে বস্তুতন্ত্রকে আগলে রাখে পরম মমতায়! আজন্ম ঋণ তাই প্রকৃতির কাছে মানবজাতির! 

বি দ্রঃ বর্তমানে দেশের অনেক জায়গাতেই “কোভিড ১৯” এর জন্যে ভ্রমনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই ভ্রমণের আগে সরকারি নির্দেশ ও নিয়মাবলী মেনে চলাটাই বাঞ্চনীয় !

Continue Reading

Bengali Edition

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদঃ- একটি ঐতিহাসিক ইকো পর্যটন কেন্দ্র

Published

on

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ
Share This Article

দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ অবসর যাপনের জন্য সর্বদা বেঁছে নিয়েছে পর্যটনকে। বিভিন্ন  ছুটিতেই পর্যটন  হোক বা ছাত্রাবস্থার শিক্ষামূলক ভ্রমণ, সকলেই বিপুলা এই দেশের নদ-নদী, অরণ্য- পর্বত, সাগর-মরুভূমি, ঐতিহাসিক স্থানের তাৎপর্য এবং প্রয়োজনীতা মেনে নিয়েছে। অতীত অগ্রাহ্য করে কখনোই বর্তমানকে জানা যায় না। তাই আমাদের সকলেরই  ঐতিহাসিক স্থানগুলো ভ্রমনের আবশ্যকতা আছে। দেশ আর দশের কথা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি জানতে ভ্রমন প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে মুর্শিদাবাদ অন্যতম। হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া, মতিঝিল, হিরাঝিল প্রভৃতি নানা দ্রষ্টব্য স্থান রয়েছে। মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ জেলার ঐতিহাসিক স্থানের সাথে সাথে একটি ইকো পর্যটন কেন্দ্রও।

মুর্শিদাবাদের ইতিবৃত্তঃ-

পুর্বে এই শহরের নাম ছিল মুখসুদাবাদ। নবাব ঔরঙ্গজেব তৎকালীন বাংলা প্রদেশের জন্য একজন সুচারু দক্ষ আর সৎ দেওয়ান খুঁজছিলেন, সেই সময়েই তাঁর নজরে আসেন মির্জা হাদি, আর কিছু বছর পরেই সমস্ত দেশ যাকে চিনবে মুর্শিদ কুলি খাঁ নামে। ১৭০০ দিল্লি থেকে মির্জা হাদি তৎকালীন বাংলা প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় আসেন বাংলার দেওয়ান এবং মুখসুদাবাদের ফৌজদার হিসাবে।

মির্জা হাদির জীবন সম্পর্কে বহুল কথা প্রচলিত আছে। কোথাও বলা আছে মুঘল শাসনকালের এক উচ্চপদস্থ প্রাক্তন কর্তা ইস্ফানের হাজি শাফি তাঁকে ইরান দেশে নিয়ে যান এবং অভিভাবক হিসেবে জত্ন-লালন করার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় শিক্ষাদান করেন। এরপর  হাজি শাফির মৃত্যুর পর মির্জা হাদি ভারতে ফিরে এসে মুঘল সরকারের অধীনে কাজ শুরু করেন। নিজের দক্ষতার জন্যই তিনি নবাবের সুনজরে পড়েন  ১৭০০ সালে নবাব ঔরঙ্গজেব তাঁকে কার্তালাব খাঁ উপাধি দান করেন। তবে নবাবের বিশ্বস্ত এবং কাছের মানুষ হয়ে ওঠার ফলে নবাব পৌত্র আজিম-উশ-শানের হিংসের শিকার হন মির্জা হাদি। এমনকি তাঁর প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দেয়। তার ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ১৭০৪ সালে ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে আনা হয় মুখসুদাবাদের গঙ্গা নদীর তীরে। তাঁর সততা আর পরিশ্রম দেখে ঔরঙ্গজেব তাঁকে মুর্শিদ কুলি খাঁ উপাধি দেন এবং বাংলা, বিহার আর উড়িষ্যার ডেপুটি হিসেবে নিযুক্ত করেন। এরপরেই মির্জা হাদি নিজের উপাধি স্বরূপ মুখসুদাবাদের নাম বদলে মুর্শিদাবাদ রাখেন। ১৭১৩ সালে বাংলা প্রদেশের নায়েব নাজিম হিসেবে তাঁকে নিযুক্ত করা হয় এবং ১৭১৭ তিনি বাংলা বিহার আর উড়িষ্যার সুবেদার হন। এই ভাবেই বাংলায় নবাবি শাসনের গোড়াপত্তন ঘটে এবং জন্ম নেয় মুর্শিদাবাদ। উল্লেখ্য ১৭৫৬ সালে আলিবুর্দি খাঁর দৌহিত্র  সিরাজ-উদ-দৌল্লা নবাব হন। তিনিই ছিলেন  বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।

এই আমলেই গড়ে ওঠে একের পর এক সুদৃশ্য প্রাসাদ, উদ্যান, মসজিদ, মন্দির, সমাধি স্থল। গজিয়ে ওঠে নানা লৌকিক-অলৌকিক গল্প-কথা, ভাগীরথির তীর ধরে হেঁটে গেলে যা আজোও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়।

মুর্শিদাবাদের জনপ্রিয় স্থানগুলো হল- হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া ও মদিনা, কাটরা মসজিদ, মতিঝিল পার্ক, জগত শেঠের বাড়ি, তোপখানা, খোসবাগ, বড়নগর রাণী ভবানীর মন্দির, রাধামাধব মন্দির, চক মসজিদ, নশীপুরের রাজবাড়ী, রোশনি বাগ, হীরাঝিল, আজিমুন্নেসা বেগমের সমাধি, জাফরাগঞ্জ সমাধি ক্ষেত্র প্রভৃতি।

 মতিঝিলের ইতিবৃত্তঃ-

মতিঝিল কথার অর্থ হল মুক্তোর ঝিল। আলিবুর্দি খাঁর জামাতা নৌজেশ আহমেদ খাঁ তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ আলিবুর্দি খাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগমের জন্য একটি অপূর্ব সুন্দর প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এই প্রাসাদের নাম ছিল সাংহী দালান, বর্তমানে একে কোম্পানী বাগ বলা হয়ে থাকে। এই প্রাসাদের তিনদিক ঘিরে ৩৫০ একরের একটি অশ্বক্ষুরাকৃতি জলাধার এবং আরেকদিক ছিল নগর সংলগ্ন। এই ঝিলটি বিখ্যাত ছিল Unino Margaritifera প্রজাতির সোনালি সাদা মুক্তোর চাষের  জন্য।  নৌজেশ আহমেদ খাঁ এবং ঘসেটি বেগম এই প্রাসাদেই বাস করতেন। তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন। এক্রামউদ্দৌলাকে দত্তক নিলেও কিছু বছর পরেই তাঁর মৃত্য ঘটে। পুত্রশোকাতুর নৌজেশ ১৭৫৫ সালেই মারা যান এবং এই মতিঝিলের সমাধি ক্ষেত্র কালা মসজিদে দত্তক পুত্রের পাশেই তাঁকে কবরস্থ করা হয়।

সাংহী দালান গড়ে তোলা হয়েছিল গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে সংগ্রহ করা কালো মার্বেল পাথর ব্যবহার করে। ১৭৫৭-১৭৮৬ সালে মতিঝিল ছিল বিভিন্ন লর্ড ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্টিংস সহ প্রমুখ  ইংরেজ কর্তাব্যাক্তিদের আস্তানা।

আমিনা বেগম এবং জৈন উদ-দ্দিন আহমেদ খাঁয়ের পুত্র তথা আলিবুর্দি খাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজ উদ-দৌল্লা এরপর সিংহাসনের অধিকার দেন। এই সিদ্ধান্তে যারপরনাই ক্ষুদ্ধ ঘসেটি বেগম নবাব-বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হন এই প্রাসাদ প্রাঙ্গনে বসেই।বলা যায় এই মতিঝিল চত্বরটিই হয়ে ওঠে সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মন্ত্রনালয়।  যুবক নবাব সিরাজকে উৎখাত করতে মীর জাফর, জগত শেঠ এবং ব্রিটিশদের মধ্যে ঘসেটি বেগম যোগসাজশ করেন নিজের প্রভূত সম্পদ এবং ক্ষমতার জেরে। ২৩ শে জুন ১৭৫৭ সালে মতিঝিল থেকেই পলাশির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌল্লা। মীর জাফরের নেতৃত্বাধীন নবাবের অধিকাংশ সৈন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ফলে অনিবার্য ভাবেই পতন হয় সিরাজের শাসনকালের।

মতিঝিলের সৌন্দর্য দেখেই ঈর্ষান্বিত সিরাজ তৈরি করেন হিরাঝিল। তবে এই কথা একবাক্যে স্বীকার করা যায় যে ভারতের শাসন ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পালাবদলের সাক্ষী এই মতিঝিল। এই প্রাঙ্গনকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ।

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদঃ-

ঘসেটি বেগমের মতিঝিল প্রাসাদ যদিও কালের প্রকোপে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে, কিন্তু সেই প্রাসাদকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বর্তমানে মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকে এটি কোম্পানি বাগ নামে পরিচিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন বিভাগের তত্ত্বাবধানে এই পার্কটি সুসজ্জিত হয়ে উঠেছে গোলাপ বাগান, পাতাবাহারি গাছ, মরশুমি ফুল, সবুজ ঘাসের নরম গালিচা এবং আরোও বিভিন্ন রকম গাছের সমারোহে। এছাড়াও সেখানে রয়েছে নবাবদের ও তাঁদের বংশের নানা মূর্তি, মিউজিক্যাল ফোয়ারা। রয়েছে আলো এবং শব্দের মাধ্যমে মুর্শিদাবাদের নানারকম ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা বিশেষ করে নবাব সিরাজ উদ-দৌল্লার পতনের ইতিবৃত্ত এখানে সুন্দর করে বর্ণনা করা হয়। সুদৃশ্য পাথর বিছানো রাস্তা চলে গেছে একেবেকে মতিঝিল পার্কের মধ্যে দিয়েই।

বাচ্চাদের জন্য রয়েছে দোলনা, সি-স, স্লিপার, টয়-ট্রেন, ড্রাগন ট্রেন সহ আরোও নানা রকম অ্যাডভেঞ্চার রাইড। পার্কের ভেতরে রয়েছে বেশ কিছু বিশ্রাম স্থল, পক্ষী আলোয়, ছবি তোলার জন্য সুদৃশ্য জায়গাও। সাইকেল, বিদ্যুৎ চালিত পরিবেশ বান্ধব গাড়ি রয়েছে, পর্যটকরা যা ভাড়া নিয়ে মতিঝিল পার্কের ভেতরে ঘুরতে পারেন। শীতকালে এই পার্কের লেকে পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে যায়। পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে সুদৃশ্য হোটেল ব্যবস্থা। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন বিভাগের নিজস্ব রিসর্ট আর হলিডে হোম এই পার্ক এর মধ্যেই অবস্থিত যা সুসজ্জিত বাগান এবং ফোয়ারা দ্বারা পরিবেষ্টিত। এছাড়া রয়েছে সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট মঞ্চ যার সংলগ্ম জমিতে ১০০ জন পর্যন্ত অতিথির স্থান সংকুলান সম্ভব। আরো ব্যবস্থার মধ্যে ১০০জনেরও বেশি পিকনিক করার স্থান, যে কোনো রকম গাড়ি স্বল্প অর্থের বিনিময়ে রাখার জায়গাও রয়েছে পার্কের মধ্যেই। পর্যটকদের জন্য মালপত্র রাখার জায়গাও আছে যেখানে প্রথম আগমনের সময়  অনুসারে স্বল্প মূল্যে ৬ ঘন্টা অবধি যেকোনো মালপত্র রাখা যায়।

কি করে যাবেনঃ-

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ থেকে মুর্শিদাবাদ রেল স্টেশনের দূরত্ব ২ কিমি এবং লালবাঘ কোর্ট রোড রেল স্টেশনের দূরত্ব ৩ কিমি। শিয়ালদহ বা কোলকাতা জংশন স্টেশন থেকে শিয়ালদহ-লালগোলা বিভাগের যে কোনো ট্রেন এ করে এই স্টেশন গুলিতে পৌছনো সম্ভব। শিয়ালদহ বা কোলকাতা জংশন স্টেশন থেকে দূরত্ব ১৯৭ কিমি।

নেতাজী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর মুর্শিদাবাদের সব থেকে নিকটতম বিমান বন্দর যার দূরত্ব পার্ক থেকে ২১০ কিমি।

এছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে বাস যাতায়াত করে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে। বাসে করে চার্চ মোড়ে, যার দূরত্ব পার্ক থেকে ১০কিমি অথবা বহরমপুরের পঞ্চাননতলা মোড়ে, যার দূরত্ব পার্ক থেকে ১৪কিমি নেমে বাকি পথ রিক্সা বা টাঙ্গা গাড়ি বা ট্যাক্সি করে যেতে হবে।

আরো পড়ুন : ইকো পর্যটন উপভোগের ১০টি কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ প্রেমীদের জন্য।

উপসংহারঃ-

এই মুর্শিদাবাদেই অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীন নবা্বী শাসনের সূর্য। শুরু হয় বাংলার বুকে ব্রিটিশরাজ। এই বাংলা থেকেই আবার জন্ম নিয়েছে একের পর এক বিপ্লবী। তাঁদের গৌরব গাঁথা অমলিন। রাজ্যের একাধিক স্থানে এরকমই অনেক ঐতিহাসিক সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে। বেশ কিছু নষ্ট হয়ে গেছে পরিচর্যার অভাবে। নাগরিক এবং সরকার দু’ তরফেরই উচিত এই সম্পদের প্রতি যত্নশীল হওয়া। ইকো পর্যটন করতে গিয়ে ঘোরার জায়গা এবং তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে দায়বদ্ধতা খুব দরকারী। যেখানে মর্জি নোংরা করা, থুতু ফেলা, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল ফেলার মতো কু-স্বভাব থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে।  পরিবেশ রক্ষা করার দায় আজ সমাজের প্রতিটি মানুষের। আজকে আমাদের পদক্ষেপের ফলেই এই বসুন্ধরা বাসযোগ্য হয়ে উঠবে আগামী প্রজন্মের জন্য

বি দ্রঃ বর্তমানে দেশের অনেক জায়গাতেই “কোভিড ১৯” এর জন্যে ভ্রমনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই ভ্রমণের আগে সরকারি নির্দেশ ও নিয়মাবলী মেনে চলাটাই বাঞ্চনীয় !

Continue Reading

Trending