একটি গাছ অনেকগুলি ‍প্রাণ - We Talk about Nature spankbang xxnx porncuze porn800.me
Connect with us

Bengali Edition

একটি গাছ অনেকগুলি ‍প্রাণ

Published

on

একটি গাছ

মরা ছোটবেলা থেকে পড়েছি এবং জেনেছি যে একটি গাছ একটি প্রাণ। কিন্তু সত‍্যি টা তায় নয় সত‍্যি টা সম্পূর্ণ আলাদা। সত‍্যি টা হোলো একটি গাছ অনেকগুলি ‍প্রাণ। এই কখাটা জেনেও অনেকে গাছ লাগানো বদলে গাছ কাটতে ব‍্যাস্ত। বিষেশ করে চোরাশিকারিদের উপদ্রব। চোরাশিকারিরা কিছু বেশী টাকার জ‍ন‍্য হাজার এর পর হাজার গাছ কেটেই চলেছে। আর কিছু হাতে গোনা মানুষ ছাড়া কেউ তাদের কে কিছু বলছে না।আজ যে শুধু গাছ অক্সিজেন দেয় তা ভাবলে আমাদের ভাবনাটা  সম্পূর্ণ ভুল। আমারা চারিদিক থেকে গাছেদের ওপরে নির্ভরশীল। শুধু আমাদের প্রজন্ম নয়, আমাদের প্রজন্ম এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ও তার পরবর্তী প্রজন্ম গাছ এর ওপর সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভরশীলই হয়ে থাকবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক না কেন গাছ কে আমাদের আজীবন লাগবে অর্থাৎ চিরকালই লাগবে। আর আমরা সেই কথা টুকু চিন্তা না করে প্রতি নিয়ত অযথা কত গাছ না কাটছি। আর এর ভয়ানক পরিনাম জেনেও তার পরিবর্তে কটা আর গাছ লাগাছি? এই রকমই চলতে থাকলে যে পৃথিবীতে আমারা বাস করি সেই পৃথিবী বলে আর কিছু থাকবে না এই ভূ-ব্রম্ভান্ডে। আমারা এই গাছ কাটার মাধ‍্যমে প্রতিদিন এক চিমটি চিমটি করে পৃথিবী কে ধ্বংস এর দিকে ঠেলে দিচ্ছি

এই প্রসঙ্গে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ‍্যাত কবিতার লাইন মনে পরে যাচ্ছে:

দাও ফিরে সে অরণ‍্য, লও এ নগর, লহ এই লৌহ,লোষ্ট্র,কাষ্ঠ ও প্রস্তর                                        হে নব সভ‍্যতা!

গাছের উপকারিতা :- আমারা মানতে বাধ‍্য যে গাছই মানুষের প্রাণ ভ্রমরা। আর আজ সেই প্রাণদায়ী সম্পদ কেই  আমারা গলাটিপে মেরে ফেলছি আর নিজেদের মহাবিপদ নিজেরই ডেকে আনছি। আর একটা কথা গাছ আমাদের নিস্বার্থ ভাবে একের পর এক প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে যাচ্ছে। যেমন- আক্সিজেন, খাদ‍্য সামগ্রী এবং জীবনযাপন এর প্রয়োজনীয়  সামগ্রী। আজ অরণ‍্যের সীমান্তে নেমে এসেছে ধূসরতা। তাই কিছু কিছু পরিবেশ সচেতন মানুষ এখন সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে  একবাক‍্যে স্বীকার করে নিয়েছেন যে–গাছ আমাদের প্রাণদায়ী বন্ধু। তাই তারা সপথ নিয়েছেন যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা যথাসম্ভব গাছ লাগাবেন।

জীবনের জন‍্য গাছ:- আজ আমারা বাতাস থেকে যে অক্সিজেন নিচ্ছি সেটার উৎস এই গাছ। অর্থাৎ অক্সিজেন পাচ্ছি গাছের কাছ থেকে। আবার আমারা নিশ্বস এর নামে যে কার্বণ-ডাইঅক্সাইড এর মতো ক্ষতিকারক বিষাক্ত গ‍্যাস ত‍্যাগ করছি। সেই ক্ষতিকারক গ‍্যাস শ্বোষণ করছে কে? এটার  উওর হবে এই গাছ। আজ যদি এই গাছপালা না থাকে তাহলে অক্সিজেন দেওয়ার আর কার্বণ-ডাইঅক্সাইড নেওয়ার কোনো মাধ‍্যম থাকবে না। আর এর ভয়ানক ফলের কথা আমারা কম বেশি সবাই জানি। এর ফলস্বরূপ হবে এই যে সকল প্রাণীজগৎ এক সাথে মৃত‍্যুর দেবতা যমরাজের কোলে ঢোলে পরবে। কিন্তু তারপর ও আমারা গাছ লাগানোর বদলে কেটে যাচ্ছি।

 “বৃক্ষ নেই, প্রাণের অস্তিত্ব নেই, বৃক্ষ হীন পৃথিবী যেন প্রাণহীণ মহাশ্মশান”     

গাছপালার প্রোজনীয়তা:-  

অফুরন্ত সৌন্দর্যের এক মাধুরী নীকূঞ্জ এই পৃথিবী। এই সুন্দর পৃথিবী কে সবুজে ভরিয়ে দিয়েছে এই প্রাণদায়ী বৃক্ষরাজিরা। এই বিশ্ব কে  সুশীতল ও সমস্ত প্রাণীকূলের বেঁচে থাকার জন‍্য বাসযোগ‍্য করে দিয়েছে এই বৃক্ষরাজিরা। এছাড়াও মানুষ এবং সমস্ত প্রাণীকূলের ছোট থেকে ছোট চাওয়ায় এবং পাওয়ার জায়গা এই বৃক্ষবিন্দের কাছেই। তাই বলা চলে সমস্ত প্রাণীকূল গাছেদের ওপর নির্ভরশীল। মানুষ এবং সমস্ত প্রাণীরা নিজেদের জন্ম থেকে মৃত্যু পযর্ন্ত গাছের উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। এই কারণে গাছেদের প্রাণীজগতের ছায়াসঙ্গী বলা যেতে পারে। গাছ আমাদের নীরব বন্ধু, ঠিক এই কারণে গাছ যে আমাদের প্রতিনিয়ত কত উপকার করে চলেছে তা ভেবে অনুধাবন করলে টের পাওয়া যাবে।

বনসম্পদ ও বনসৃজনঃ- সভ‍্যতা কে বাঁচিয়ে রাখতে  প্রয়োজন বনসৃজনের। প্রাণধারণ করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও খাদ‍্যের এবং পরিবেশ কে দূষণ মুক্ত রাখতে প্রয়োজন বন সংরক্ষণের। প্রাকৃতিক ভারসাম্য সঠিক রাখতে গাছপালার ভূমিকা অস্বীকার্য। এই সমস্ত ছোট বড়ো কখা ভেবে অরণ‍্য সংহার রোধ করা দরকার।

বৃক্ষরোপণের গুরুগম্ভীর গুরুত্বঃ- পৃথিবীর মঙ্গলার্থে, সমগ্র জীবকূলের মঙ্গলার্থে তথা মানবজাতির মঙ্গলার্থে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব অক্লপনীয়।

1) গাছ আমাদের তথা সমস্ত প্রাণী কূলের বিষাক্ত কার্বন-ডাইঅক্সাইড গ্রহণের পরিবর্তে প্রাণদায়ী অক্সিজেন ফিরিয়ে দেয়। এই কারণে প্রাণীরা এই ভূ-ভাগে বেঁচে থাকতে পারে।

2)গাছ সমগ্র প্রাণীজগৎকে খাদ‍্য দেয়। এই গাছের ফুল, ফল, লতা-পাতা খেয়ে প্রাণীকূল বেঁচে থাকে।

3)আসবাবপত্র, গৃহ, নৌকা, জাহাজ, বাঁধ, সেতু ইত্যাদি র্নিমানে গাছ আমাদের কাঠ দেয়।

4)বন থেকে আমারা মধু, মোম, জ্বালানি ইত্যাদি পেয়ে থাকি।

5)গাছপালা মাটির উর্বরতা বাড়ায়। মাটির ক্ষয় রোধ করে।

6)গাছপালা দেশের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে।

7)গাছপালা আমাদের জীবনরক্ষার বিভিন্ন ঔষুধ প্রদান করে।

8)সৌন্দ্রর্য বন্ধনেও গাছের যথেষ্ট ভূমিকা আছে।

প্রাচীনকাল থেকে গাছের অবদানঃ- যুগ যুগ ধরে সমস্ত প্রাণীজগৎ গাছের সাথে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। প্রাচীন ভারতে বনভূমি গড়ে ওঠার আশ্রমিক শিক্ষার কথা আমারা সকলেই কম বেশী জানি। প্রাচীনকাল থেকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে সাফল‍্য এনে দিয়েছে এই গাছপালা। 

অরণ‍্য বন্দনাঃ- কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আধুনিক ভারতে বৃক্ষরোপণ উৎসবের সূচনা করেছিলেন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ও রাজ‍্য সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহন করেছেন। বতর্মানে প্রতিবছর উৎসাহের সাথে পালিত হচ্ছে “বনসৃজন সপ্তাহ”।

উপসংহারঃ- অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কেবল বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ পালন করে সরকারি ভাবে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জনসেবা করলেই দেশে সবুজায়ন হবে না। সবুজায়নের গুরুগম্ভীর গুরুত্বটা সমাজে জানিয়ে সমাজকে সচেতন করতে হবে। সমাজের সব শ্রেণীর মধ‍্যে “একটি গাছ অনেকগুলি ‍প্রাণ / গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান ” – এই বোধ জাগ্রত করতে হবে। মানুষের সচেতনতার হাত ধরে দেশে আবার “সবুজ বলকা” পাখা মেলবে। আর আমারা সবাই একসাথে এক সূরে বোলবো–

এই সুদৃস‍্য সবুজের পথ ধরে, র্নিভয়ে আমি হেঁটে চলেছি ,আমার কবিতার হাত ধরে।।

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Bengali Edition

পরিবেশ আইন প্রণয়ন, রূপায়ণ এবং তার আলোচনা

Published

on

পরিবেশ আইন
Image credit : Pixabay from Pexels

রিবেশের সাথে মানবসমাজের সম্পর্ক নিবিড়। পরিবেশের অন্যান্য জীবজন্তুর, বৃক্ষ-গুল্মের সাথে সাথে মানুষের জীবনও সমান ভাবে বহমান। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর ভর করে মানুষ যত এগিয়ে চলেছে সুখকর জীবনের দিকে ততই দূরে সরে এসেছে পরিবেশ থেকে। শিল্প কারখানা এবং  গৃহস্থালির বর্জ্যের নিষ্কাশন, নির্বিচারে বন কেটে চাষ আবাদের জমি, বসতবাড়ি নির্মাণ প্রভৃতির মাধ্যমে আমরা পরিবেশের ক্ষতি করছি অহরহ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, ১৮৪৮ সালে Metropolitan Commission of Sewers Act এর মাধ্যমে লন্ডনের সমস্ত নালা-নর্দমার মুখ বন্ধ করে দিলে ১৮৫৮ সালে নাগরিকদের কার্যকলাপে টেমস নদী গ্রীষ্মকালে নোংরা দুর্গন্ধ পুঁতিময় হয়ে উঠেছিল যে সাধারণ জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে যায়। এই ক্ষতিসাধনের ওপর লাগাম টানতেই সরকার থেকে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন পরিবেশ আইন। ১৯৭২ সালে স্টকহোম সম্মেলন থেকে শুরু করে সমগ্র বিশ্বে এই পরিবেশ  আইন প্রণয়নের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার জন্য এখনোও পর্যন্ত প্রায় ৩০০০ টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে সম্মেলনগুলো কেবলমাত্র কিছু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

  • পরিবেশ আইন প্রণয়নের কারণ:-

পরিবেশ আইন প্রণয়নের অন্যতম কারণগুলো- ক) পরিবেশ এবং মানব স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, খ) প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষা, গ) সুরক্ষিত ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। বায়ুর মান, জলের মান, আবর্জনা ব্যবস্থাপনা, দূষিত পদার্থ এবং রাসায়নিক বস্তুর উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই আইনগুলো প্রণয়ন করা হয়ে থাকে।

৹ বায়ুর মান নিয়ন্ত্রণ আইন:-

বায়ুর মধ্যে মিশে থাকা দূষক পর্দাথের পরিমাণ কমিয়ে মানব স্বাস্থ্যের দিকে নজরদারি করাই আইনের মূল লক্ষ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে পৃথিবীতে ৪.৬ মিলিয়ন মানুষ প্রতি বছরে মারা যায় কেবলমাত্র খারাপ বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ফলে। বায়ু আইনের দ্বারা ওজোন স্তরের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ক্ষতি হওয়া নিয়ন্ত্রণ করা, অ্যাসিড বৃষ্টির কারণ এবং আবহাওয়া বদলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও আয়ত্বে রাখার চেষ্টা করাও এই আইনের অন্যতম লক্ষ্য।

৹ জলের মান নিয়ন্ত্রণ আইন:-

এই আইনে প্রধানত নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয় জলে মিশে থাকা দূষক পদার্থ দূরীকরণের। জমিয়ে রাখা স্বাদু জল, ভূগর্ভস্থ জল এবং ভূপৃষ্ঠে থাকা জল এই তিন ক্ষেত্রেই আইন প্রযোজ্য। উল্লেখ্য খারাপ মানের জল পান করে সারা ভারতে ২০১৫ সালে ১.৮ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্বাদু বা পানীয় জলের ক্ষেত্রে যে আইন রয়েছে তা মূলত মানব স্বাস্থ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। জলের রাসায়নিক, শারীরিক, তেজস্ক্রিয় এবং জৈবিক গুণগত বৈশিষ্ট্যদের নিয়ন্ত্রণে রেখে জলীয় বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষার জন্যেও আইন প্রণয়ন করা হয়ে থাকে।  সমুদ্রের জলে নানা বর্জ্য পদার্থ, প্লাস্টিক, তেল মিশে প্রবাল প্রাচীর, সামুদ্রিক মাছ, কচ্ছপের চরম ক্ষতি সাধনও হচ্ছে।

৹ আবর্জনার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ আইন:-

এই আইনে প্রধানত আবর্জনা সংগ্রহ করা, ব্যবস্থা করা, জমিয়ে রাখা এবং নিষ্পত্তির ব্যবস্থা সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। এই সমস্ত আবর্জনাতে গৃহস্থালি এবং মিউনিসিপ্যালিটির বর্জ্য, বিপজ্জনক বর্জ্য, শিল্পাঞ্চল এবং পারমাণবিক বর্জ্য পদার্থও রয়েছে। আবর্জনা নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে বর্জ্য উৎপাদন কমানো এবং রিসাইক্লিং করার ব্যবস্থাও করা হয়।

৹ রাসায়নিক বস্তু নিয়ন্ত্রণ আইন:-

উক্ত আইনে মনুষ্য নির্মিত তথা কলকারখানা, শিল্পাঞ্চল থেকে নিষ্কাশন করা বিভিন্ন রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। চাষের জমিতে প্রয়োগ করা রাসায়নিক সার, কীটনাশকও এর মধ্যে আছে। আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক বস্তু ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

  • বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিবেশ আইন সমূহ:-

পৃথিবীর কয়েকটি উপমহাদেশ এবং দেশের পরিবেশ সংক্রান্ত আইন নিম্মে তুলে ধরা হলো-

আফ্রিকা মহাদেশ:-

প্রতি বছর আফ্রিকায় ৭,৮০,০০০ মানুষের মৃত্যু হয় নিম্ম মানের বায়ুর কারণে। NASA -এর একটি রিসার্চে দেখা গেছে মূলত সাহারা মরুভূমির ধূলিঝড়ই দায়ী। HIV রোগে এবং বায়ুদূষণের কারণে মৃত মানুষের পরিমাণ প্রায় সমান।

সেকশন ২৪- সংবিধানে এই সেকশনে সকলকে সমানভাবে পরিবেশ ব্যবহারের সুবিধা দান করে।

সেকশন ২৪ (বি)- সরকারকে পরিবেশ রক্ষার্থে “যুক্তিসঙ্গত আইনী ব্যবস্থা এবং ব্যবস্থা) গ্রহণ করতে হবে।

সেকশন ২৪ (বি)(i)- সরকারকে পরিবেশগত অবক্ষয় এবং দূষণ রোধ করতে হবে। 

এছাড়াও সরকারি উৎসাহে অচিরাচরিত শক্তির ব্যবহার, দূষণরোধী প্রযুক্তি ব্যবহার করার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। তার সাথে সাথেই চলছে ডিজেল এবং পেট্রোলে সালফারের ব্যবহার কমানো, বাড়ি এবং কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ খোলা জায়গাতে আগুনে পোড়ানো, গৃহস্থালির খাবার তৈরির জন্য ব্যবহৃত দাহ্য পদার্থ, বিভিন্ন যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়ার মান আরোও নানারকম বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে।

৹ এশিয়া:-

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী সারা বিশ্বের বায়ু দূষণে মৃত ৭ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে কেবলমাত্র ২.২ মিলিয়ন মানুষ এশিয়া থেকেই মারা যান। বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ এবং জল দূষণের মধ্যেও এশিয়ার দেশগুলো বেশ এগিয়ে। 

পরিবেশ আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবে রূপান্তর করার জন্য করার জন্য এশিয়া মহাদেশের ১৩ টি দেশ নিয়ে গঠিত হয় এশিয়া এনভায়রনমেন্টাল কমপ্লায়েন্স অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক (AECEN)। এই ১৩টি দেশের মধ্যে চিন, ভারত, জাপানসহ,  একাধিক দেশ রয়েছে।

৹ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন:-

European Environmental Agency -এর তত্ত্বানুসারে ২০১৫ ইউরোপে ৫,০০,০০০ মানুষ মারা গেছেন দূষিত বায়ুর প্রভাবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বেশ কিছু দূষণজনিত আইন তৈরী করেছে। অস্ট্রিয়া, মালটা, লুক্সেমবার্গ, জার্মানি, ইটালি, স্পেন, গ্রিস সহ ২৮টি ন্যাশনাল স্টেট মেম্বার এই আইনের আওতায় আসে।

এই আইনগুলো হলো-

১) জল বায়ু পরিবর্তন

২) বায়ুদূষণ

৩) আবর্জনার ব্যবস্থাপনা

৪) জল দূষণ

৫) নাগরিক নিরাপত্তা এবং প্রভৃতি। 

উল্লিখিত যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইউনাটেড স্টেটসের পরিবেশ সুরক্ষা এজেন্সির সাথে যুক্ত হয়ে নিজের দেশগুলোতে জলদূষণ এবং জলজ বৈশিষ্ট্যের রক্ষা করা, পরিশ্রুত জ্বালানি এবং যানবাহন, পরিবেশের সুরক্ষা এসবের দিকে কাজ করছে। 

  • ভারতের পরিবেশ আইন প্রণয়ন ও রূপায়ন:-

ভারতে স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই বেশ কিছু পরিবেশ সংক্রান্ত আইন তৈরি করা হয়েছিল। তবে ১৯৭২ সালের স্টকহোম বৈঠকের পরেই সমস্ত দেশগুলোতে পরিবেশ সুরক্ষার সম্পর্কে জোর দেওয়া হয়। ভারতে ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস ঘটনার পর থেকে পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর বিশেষ নজরদারি করা হয়। তৈরি করা হয় পরিবেশ সুরক্ষা অ্যাক্ট, ১৯৮৬ সালে। সংবিধানের আর্টিকেল ৫১এ -তে বলা আছে প্রত্যেক ভারতবাসীর নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব এই দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ (বন, নদী, জলাশয়, জীবজন্তু) রক্ষা করা। আর্টিকেল ৪৮এ -তে রাজ্যের হাতে পরিবেশের দূষণ রোধ এবং বন্যপ্রাণী আর বনাঞ্চলের রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নিম্মে ভারতের কিছু পরিবেশ সংক্রান্ত আইন এবং অধিনয়মের আলোচনা করা হলো-

৹ বায়ু (দূষণ রোধ এবং নিয়ন্ত্রণ) অধিনিয়ম, ১৯৮১ সাল:-

এই অধিনিয়মের মাধ্যমে প্রধানত বায়ুতে মিশে থাকা দূষক পদার্থের রোধ, নিয়ন্ত্রণ এবং তা কমানোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন প্রকারের জ্বালানি, দূষক পর্দাথের ফলে হওয়া বায়ুদূষণ এবং আমাদের চারপাশের সংলগ্ন বায়ুর মান সঠিক রাখতে এই অ্যাক্ট বা অধিনিয়মের ব্যবহার করা হয়। রাজ্য সরকারের দূষণ নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রক থেকে বিভিন্ন শিল্প কারখানা অনুমোদন নিতে হবে দূষণ নিয়ন্ত্রণ এলাকাতে শিল্পোৎপদান করার সময়ে। সরকার সেই সমস্ত এলাকার বায়ুর মান, দূষণ নিয়ন্ত্রণকারী প্রযুক্তি এবং উৎপাদন প্রসিডিউর খতিয়ে দেখেন।

৹ জল (দূষণ রোধ এবং নিয়ন্ত্রণ) অধিনিয়মের, ১৯৭৪ এবং ১৯৭৭ সাল:-

দেশের ভূগর্ভস্থ এবং ভূপৃষ্ঠে থাকা জলের উৎসে রক্ষা করা তার সঙ্গেই জল দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নিয়ন্ত্রণ করা এই অধিনিয়মের আওতাভুক্ত। একটি নির্দিষ্ট মানের পরে জলে আবর্জনা নিকাশ করলে তা শাস্তিযোগ্য। কেন্দ্রীয় সরকারের দূষণ নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রকের পক্ষ থেকেই মূলত এই মান নির্ধারণ করা এবং রাজ্য সরকার সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করে।

১৯৭৭ সালে জল কর আইন চালু তৈরি হলো। যার মাধ্যমে জলের ব্যবহারের জন্য নাগরিকদের নির্দিষ্ট কর কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারকে দিতে হতো। ২০০৩ সালে এই অধিনিয়মের অন্তিম সংশোধন হয়।

৹ বিপজ্জনক আবর্জনা ব্যবস্থাপনা অধিনিয়ম:-

এই আইনের মাধ্যমে প্রধানত জৈবিক, রাসায়নিক, প্রতিক্রিয়াশীল, বিষাক্ত, দাহ্য, বিস্ফোরক প্রভৃতি ক্ষতিকারক উপাদান বা যার সংস্পর্শে আসার ফলে প্রাণী এবং উদ্ভিদ জগতের ক্ষতিসাধন হতে পারে এমন আবর্জনা নিকাশ এবং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। 

১৯৪৮ সালের কারখানা অধিনিয়ম, ১৯৯১ সালের নাগরিক দায়বদ্ধতা অধিনিয়ম এবং ১৯৯৫ সালের জাতীয় পরিবেশ ট্রাইব্যুনাল অধিনিয়মের আওতায় বিপজ্জনক আবর্জনা নিকাশের কিছু নিয়ম তৈরি করা হয়েছে। যেমন-

১) বায়োমেডিক্যাল (ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা) আইন, ১৯৯৮ সালে।

২) পুরসভার কঠিন বর্জ্য পদার্থ (ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা) আইন, ২০০০ সালে।

৩) বিপজ্জনক আবর্জনা (নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০০৮ সালে।

  •  পরিবেশ আইনের অসফলতা:-

সমগ্র বিশ্বে বিগত কয়েক বছর ধরেই একের পর এক পরিবেশ আইন প্রণয়ন এবং রূপায়ন হয়ে এসেছে। কিন্তু তারপরেও দেখা যাচ্ছে বাতাসের মান ক্রমশ শ্বাস-প্রশ্বাসের অযোগ্য হয়েছে উঠেছে, সামুদ্রিক প্রাণীদের শরীরে পাওয়া যাচ্ছে প্লাস্টিক, জৈবিক এবং রাসায়নিক আবর্জনার  নিকাশ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, চোরাশিকারিদের উপদ্রবও বেড়েই চলছে। কিছু কারণ আলোচনা করা হলো-

১) রাজনৈতিক এবং নাগরিকদের মধ্যেও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রতি সদিচ্ছা এবং সচেতনতার অভাব দেখা যায়।

২) প্রায় সমস্ত আইন এবং অধিনিয়মে মানব জাতিকে মুখ্য রাখা হয়েছে, বাস্তুতন্ত্র এবং পরিবেশকে গৌণ করে রাখা হয়েছে।

৩) যে সমস্ত আইনগুলো কার্যকর আছে সেসব কেবলমাত্র নির্দিষ্ট রকমের দূষণ এবং নির্দিষ্ট রকম আবর্জনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

৪) কঠিন জরিমানার অভাবে শিল্প কারখানার মালিকেরা, নাগরিকেরা পরিবেশের চরম ক্ষতি করেও নিয়মগুলোকে শিথিল ভাবে মেনে চলেন।

  • সমাধান:-

১) দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে হবে। যার কাছে পুরো ঘটনা পর্যবক্ষেণ এবং পর্যালোচনা করা, নিয়ম তৈরী করা এবং তা রূপায়ন করার স্বতন্ত্র ক্ষমতা থাকবে।

২) রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ কমিয়ে বৈজ্ঞানিক, এবং পরিবেশবিদ মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে।

৩) উন্নত প্রযুক্তি গড়ে তুলতে হবে দূষণ রোধে।

৪) সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব দূর করে, দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানাতে হবে।

৫) পরিবেশন দূষণ আইনগুলোর আমূল পরিবর্তন ঘটানোর সাথে সাথে আরোও দৃঢ় এবং শক্তিশালী করে তুলতে হবে।

৬) দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের হাতেও পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্ষমতা দিতে হবে।

  • উপসংহার:-

নীতি আয়োগ দপ্তরের তথ্যানুসারে কেবলমাত্র ভারতেই বায়ুদূষণের ফলে ১.২ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। ভূপৃষ্ঠস্থ জলের ৭০% দূষিত হয়ে পান করার অযোগ্য হয়ে উঠেছে। ১ লক্ষ আমেরিকান প্রতিবছর মারা যাচ্ছে কেবল দূষিত বায়ুতে শ্বাস নিয়ে। আবর্জনার অপরিকল্পিত নিকাশের ফলেও মশা-মাছি এবং ইঁদুর বাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। দেখা দেয় ভূমি ক্ষয়, জলের গুণগত মান নিম্নমুখী। যার প্রভাব মানুষ, জলজ জীবের সাথে সাথে দেশের অর্থনীতির ওপরেও এসে পড়ে। এই সমস্ত কারণের ফলেই বিশ্বের প্রতিটি দেশের পরিবেশ আইন আরোও জোরদার করা দরকার।

Nature Talkies declaration: This content is written by the contributor. If you have any suggestion or want to update more information or report us then contact at info@naturetalkies.com

Continue Reading

Bengali Edition

পরিবেশ দূষণ রোধে ছাত্রছাত্রী দের ভূমিকা

Published

on

পরিবেশ দূষণ
Image Credit : Pixabay (Syaibatulhamdi)

শিক্ষাজীবনের সেই শুরু থেকেই পরিবেশ দূষণ আমাদের শিক্ষার্থীদের কাছে এক সুপরিচিত শব্দ; কখনো বইয়ের পাতায় কখনো বা আবার আওয়াজ ওঠার নতুন এক মাধ্যম হিসেবে। বইয়ের পাতায় পরিবেশ দূষণকে আমাদের উপমহাদেশীয় শিক্ষার্থীরা সবসময় পেয়ে এসেছে একেবারেই তাত্ত্বিকভাবে- পরিবেশ দূষণ কী, কেনো হয়, কীভাবে হচ্ছে বা হয়ে আসছে প্রাচীনকাল থেকে, এর থেকে উত্তরণের উপায় কী ইত্যাদি নানা ভারী শিরোনামে। কমবেশি সামাজিক পরিবেশ নিয়ে পড়ার শুরুতেই একজন শিক্ষার্থী জানতে শুরু করে তার আশেপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়েও, সাথে সাথে জানতে পারে বায়ু, জল, মৃত্তিকা, আলো, শব্দ, তেজস্ক্রিয় ও সর্বোপরি পরিবেশ দূষণ নিয়ে। বেশিরভাগের দৌঁড়ই বোধহয় আটকে থাকে এসব বইয়ের পাতায় পাতায় পড়ে সেগুলোকে পরীক্ষার খাতায় লেখার মধ্যেই। কিন্তু এই প্রজন্মে এসে একদল শিক্ষার্থীই যে এই পরিবেশ দূষণ বা জলবায়ু সংক্রান্ত সবগুলো বিষয়ের ইতিহাস নতুন করে লিখতে শুরু করবে এই বিষয়ে বোধহয় আমাদের আগের প্রজন্মের ঐতিহাসিকদের কারোরই ধারণা ছিলো না! এদের মধ্যে গ্রেটা থুনবার্গ সবচেয়ে কনিষ্ঠ; এছাড়াও আছে জিয়ে বাস্তিদা, ভিক ব্যারেট, জল পল জোনস, লুইসা নিউবার প্রমুখ। এর সাথে সাথে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু সতর্কবাণী সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে আছে ফ্রাইডেস ফর ফিউচার, আইপিসিসি, ক্লাইমেট অ্যাকশান নেটওয়ার্ক প্রমুখ। 

পরিবেশ দূষণের সেকাল-একাল 

কিছুক্ষণ আগেই বলছিলাম আমাদের উপমহাদেশের পরিবেশ ও জলবায়ু শিক্ষণ নিয়ে, আরেকটা গভীরে যাওয়া যাক। পরিবেশ মূলত আমাদের চারপাশের সমস্ত জৈব ও অজৈব উপাদানের সামষ্টিক সমাহার। জৈব উপাদানের মধ্যে আছে- জীবিত ও মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণী এবং অজৈব উপাদানের মধ্যে আছে- অক্সিজেন, কার্বনডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, সালফার, অ্যামিনো অ্যাসিড, হিউমার ইত্যাদি। 

যখন জৈব ও অজৈব উপাদান মিলে পরিবেশের নানান উপাদান তৈরি হয় তখন এরা নানা দূষকের সংস্পর্শে এসে থাকলে পরিবেশ দূষণ ঘটে। আর এই পরিবেশ দূষণকে বর্ণনার সুবিধার্থে বিজ্ঞানীরা সাত ভাগে ভাগ করেছেন- 

  • বায়ু দূষণ
  • জল দূষণ
  • মৃত্তিকা দূষণ 
  • আলো দূষণ 
  • শব্দ দূষণ 
  • তেজস্ক্রিয় দূষণ 
  • তাপীয় দূষণ 

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র মতে, বিশ্বের প্রতি ১০ জনের ৯ জন এখন প্রশ্বাস কার্য চালানোর জন্য শুদ্ধ বাতাস পান না। আর শুধুমাত্র এই বায়ু দূষণের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষ মারা যাচ্ছেন। বাতাসে উপস্থিত মাইক্রোস্কোপিক দূষকগুলো আমাদের অজান্তেই আমাদের শরীরের মধ্যে ঢুকে শ্বাসতন্ত্রের নানান রোগের উদ্রেক ঘটায়। তাই যদি আমাদের এই দূষণ থেকে বাঁচতে হয়, অবশ্যই সবগুলো দেশকে একসাথে উদ্যোগ নিতে হবে; কারণ বাতাস সবসময় সবজায়গাতেই বিরাজমান। 

    The World Counts র একটি হিসেব বলছে শুধুমাত্র ২০২০ সালে জল দূষণের প্রভাব হিসেবে এখন পর্যন্ত ১৭,৮৬,৪৮৭ জন মারা গেছে। এক বছর হিসেবে এইটা অনেক বেশি, কিন্তু এর বাইরেও যে হাজার হাজার মৃত্যু প্রতিবছর পানিবাহিত রোগগুলোর কারণে হয়ে গেছে সেটি আরো ভয়াবহ। 

    Research Gate র তথ্যমতে, প্রতিদিন শুধুমাত্র ভারতেই ৩৩৯০০ মিলিয়ন লিটার নগর বর্জ্য ও ২৩৫০০ মিলিয়ন লিটার রাসায়নিক বর্জ্য নদী ও মাটিতে উন্মুক্ত হয়। এই পরিমাণ বর্জ্য সরাসরি মাটিকে দূষিত করে ও এর মধ্যে বিদ্যমান জৈব পদার্থগুলোকে মেরে ফেলে। যার ফলে দিনে দিনে মাটি হয়ে যায় অনুর্বর ও অনেক বেশি অফসলি। 

    নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টগুলো তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বিকিরণ করে, যা কিনা বাকি সমস্ত ভৈত বর্জ্যের চেয়ে হাজারগুণে বেশি ভয়ংকর। প্রতিনিয়ত এইসব প্ল্যান্ট থেকে যে আলফা, বিটা, গামা রশ্মি বিচ্ছুরিত হয় এদের প্রত্যেকেরই আছে স্বাস্থ্যের উপর আলাদা আলাদা প্রভাব। 

দূষণ রোধে ছাত্রসচেতনতা 

দূষণ রোধে ছাত্রসমাজের মধ্যে সচেতনতা বিস্তার আবশ্যিকভাবে অন্যতম একটি উপায় দূষণের মাত্রা হ্রাস করার। কিন্তু সেটা অবশ্যই দুই পক্ষ থেকেই সমানভাবে হওয়া উচিৎ; অর্থাৎ আমাদের ছাত্রদের একদিকে সচেতন হওয়া উচিৎ ও অন্যদিকে তার আশেপাশের মানুষগুলোকে সচেতন করা উচিৎ। কিন্তু আদতে এই চর্চা অনেকগুলো দিন পর্যন্তই একেবারে থেমে ছিলো। 

জলবায়ু নিয়ে বা পরিবেশ সম্পর্কিত বিষয়গুলোতে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা বরাবরই সুবিধাবাদীর ভূমিকা পালন করেছেন। তারা পরিবেশের সমস্ত সুবিধা নিয়েছেন ঠিকই কিন্তু এগুলোকে সুন্দরভাবে পরিচর্যা বা ব্যবস্থাপনা করার কথা কখনোই চিন্তা করেন নি। যার কারণে তাদের প্রণীত সকল আইন, প্রস্তাবনা ও নীতিমালা পরিবেশবান্ধব নয়৷ এই প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হয়ে উঠলেন পরিবেশ আন্দোলনে। 

পূর্বের সবগুলো পরিবেশ আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা সবসময়ই ছিল সামনের সারিতে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মাধ্যমেই সূত্রপাত হয়ে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এরকম আন্দোলন বিশ্ব একুশ শতকের আগে খুব বেশি একটা দেখেনি৷ IPCC বা Climate Action Network পরিবেশবাদীদের সংঘ হলেও এখানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ শুধুমাত্র কয়েকজন কর্মী হিসেবে। পরবর্তীতে যখন গ্রেটা থুনবার্গ ২০১৮ সালে সুইডেন থেকে প্রতি রবিবার তার স্কুল বন্ধ করে সুইডিশ পার্লামেন্টের সামনে বসে থাকতে লাগলো তখন গিয়ে পরিবেশ দূষণ/জলবায়ু সম্পর্কিত কাজে তরুণদের প্রভাব বা তাদের কর্মঠ অংশগ্রহণ দেখলো বিশ্ব। আস্তে আস্তে যখন সুইডেন থেকে একে একে জার্মানি, কানাডা, আমেরিকা, ইংল্যান্ড হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে Fridays For Future তার আসন গেড়ে দিল তখন কোটি কোটি স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত হলো সারাবিশ্বের রাজপথ। 

গ্রেটার সাথে আরো এগিয়ে এলো বিশ্বের তরুণ নেতৃবৃন্দ, আমেরিকা থেকে জিয়ে বাতিসদা, ভিক ব্যারেট, ইসরা হিরসি, আলেকজান্দ্রিয়া; স্কটল্যান্ডের হলি গিলবার্ট; উগান্ডার লিয়াহ নামুগারওয়া, কানাডার অটাম পেলটিয়ার প্রমুখ৷ সবার লক্ষ্য একটাই-জলবায়ু ও পরিবেশের সাথে এতোদিন ধরে যে অন্যায় হয়ে এসেছে সেগুলো রোধ করতে হবে৷ নতুন জলবায়ু নীতি লাগবে ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে৷ 

প্রথ দিককার সবগুলো আন্দোলন এলাকাভিত্তিক হলেও আস্তে আস্তে জলবায়ুর এই স্রোত এগিয়ে যেতে লাগলো বিশ্বের সমস্ত দেশে, একত্র হতে লাগলো বিশ্বের সমস্ত পরিবেশপ্রেমী; অবিবেচক নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শুরু হলো প্রতিবাদ।

মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছাত্রআন্দোলন

পরিবেশ আন্দোলন প্রথম সার্বজনীন রূপ লাভ করে ২০১৯ সালের ১৫ই মার্চ। গ্রেটা থুনবার্গ যখন একদিন একদিন করে কতোগুলো সপ্তাহ তার একক আন্দোলন চালিয়ে গেল তখন ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে, বিশেষত টুইটারে হাজারও পরিবেশপ্রেমী তাদের ক্ষোভ জানাতে লাগলেন। একটা সময় মার্চের ১৫ তারিখে বিশ্ব দেখল প্রথম ‘বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘট’, সেবার প্রায় ১১৫টি দেশ এই ধর্মঘটে অংশ নিয়েছিল। 

মার্চের গণআন্দোলন সীমিত হতে না হতেই আবারও মে মাসে নতুন গণজোয়ারের সৃষ্টি হলো। এবার ১২০টির বেশি দেশ ও ১৫০০ র বেশি শহরে একসাথে অনুষ্ঠিত হলো দ্বিতীয় ‘বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘট’, একইসাথে ‘ক্লাইমেট ইমার্জেন্সি’ জারি করলো কানাডা, নিউজিল্যান্ডও আরো কতোগুলো রাষ্ট্র।

সেপ্টেম্বর মাসে ২০-২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত হলো UN Climate Summit, যেখানে প্রায় ২২টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিশ্রুতি ও কূটনৈতিক আলোচনায় জলবায়ু সম্মেলন পেলো এক নতুন মাত্রা৷ অন্যদিকে ২৭ সেপ্টেম্বর হয়ে গেল তৃতীয় ‘বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘট’। 

গ্রেটার অনুপ্রেরণায় দেশে দেশে তরুণ শিক্ষার্থীরা ফুঁসে উঠলো জলবায়ু নিয়ে নানান আলোচনায়৷ কথা বলতে শুরু করলো জলবায়ু ভিত্তিক নানান দফা ও প্রস্তাবনা নিয়ে। 

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়-কোনো সেক্টরের শিক্ষার্থীই বাদ নেই এই পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে নিজেকে শামিল করতে। স্কুলে পড়া তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর বাইরে এসে এখন সবাই সরকার/নীতিনির্ধারকদের জলবায়ু নিয়ে তৈরি করা ভুল নীতি নিয়ে সমালোচনায় ব্যস্ত, কেউ আবার ব্যস্ত সমাধান তৈরিতে৷ নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা তাই শুধুমাত্র পরিবেশ দূষণ রোধ করতেই নয়, পরিবেশকে নতুন একটি সংজ্ঞায়ন দিতেও বদ্ধপরিকর! 

পরিবেশ আন্দোলনে আগামী ছাত্রনেতৃত্ব 

বর্তমান ছাত্রসমাজ আগামীর পরিবেশ আন্দোলনে নীতিনির্ধারণী ভূমিকাতে থাকবে একথা কোনো সন্দেহ ছাড়াই বলা যায়। কেননা পৃথিবীর এই মৌলিক সমস্যাকে এরা শুধুমাত্র সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেই বসে নেই বরং নিত্যনতুন সমাধান খুঁজতে দিনরাত এক করে পরিশ্রমও করে চলেছে। পরিবেশ দূষণ রোধে কীভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব কমানো যায়, কীভাবে প্লাস্টিক রিসাইকেল করা যায় কোনো বাড়তি বর্জ্য ছাড়াই, কীভাবে পলিথিন প্রক্রিয়াজাত করা যায় কোনো কার্বন নিঃসরণ ছাড়া এইসমস্ত বিষয়ে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গবেষণা করেই চলেছে ছাত্রসমাজ৷ তাই সেদিন হয়তো বেশি দূরে না যেদিন কিনা এই ছাত্রসমাজের হাতেই থাকবে দেশের পরিবেশ নীতি এবং ছাত্রদের দক্ষ গবেষণা ও নেতৃত্ব আমাদেরকে উপহার দেবে একটি প্লাস্টিকমুক্ত, সবুজ, শুদ্ধ পৃথিবী। 

Read if you like: Environmental Science for Kids.

Nature Talkies declaration: This content is written by the contributor. If you have any suggestion or want to update more information or report us then contact at info@naturetalkies.com  

Continue Reading

Bengali Edition

পরিবেশ আন্দোলন এবং ভারতের বুকে তার বিস্তার

Published

on

পরিবেশ আন্দোলন
Image Credit : Pixabay (doodlartdotcom )

মানুষের সাথে পরিবেশের যোগসূত্র আদিকাল থেকেই। প্রকৃতিই আমাদের দান করছে অক্সিজেন থেকে শুরু করে পরিধেয় বস্তু, খাদ্যসহ বিভিন্ন জীবনের রসদ। মানব সমাজ যে চিরকাল একতরফা ভাবে কেবল গ্রহণই করে গেছে তা নয়, পরিবেশ রক্ষার্থে নিজের জীবনও উৎসর্গ করেছেন বিভিন্ন সময়ে। আজ “পরিবেশ আন্দোলন”- এর কথা মাথায় এলেই আমাদের মনে পড়ে পশ্চিমা দেশে ঘটে যাওয়া ভিন্ন ভিন্ন আন্দোলনের কথা। মনে পড়ে ১৯৫৬ সালে জ্যাকিউস কস্টিউয়ের বিতর্কিত ডকুমেন্টারি সিনেমা দ্যা সাইলেন্ট ওয়ার্ল্ড। মনে পড়ে ১৯৬২ সালে র‍্যাচেল করসনের অন্যতম বই সাইলেন্ট স্প্রিং। ১৯৫০ থেকে ১৯৬২ সাল ইউনাইটেড স্টেটসে যে বিপুল পরিমাণ ডিডিটি এবং কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছিল তাকে কঠোরভাবে আক্রমণ করা হয় এই বইতে। পুঁজিপতিদের বিরোধিতা সত্ত্বেও এই বইয়ের প্রতিটি কথা সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং ধরা হয় আধুনিক যুগের পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম অনুঘটক এই বইটি। যার ফলস্বরূপ ১৯৭২ সাল থেকে ইউএসএতে ডিডিটি ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই বছরেই ইউনাইটেড নেশনস ৫ই জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশগুলোর ভেতর পরিবেশ নিয়ে এই আলোড়নের অনেক আগেই এবং তাদের সমসাময়িক সময়েও আমাদের দেশে ঘটে গিয়েছে একের পর এক পরিবেশ আন্দোলন। অষ্টাদশ শতকে বিষ্ণোই আন্দোলন থেকেই সূচনা হয়েছিল ভারতের বুকে একাধিক পরিবেশ আন্দোলন।

পরিবেশ আন্দোলন কী এবং কেন:-

যখনই জনগণের একাংশ কোনো সামাজিক অবক্ষয়ের মুখোমুখি হয় তখন মানব মনস্তাত্ত্বিক গঠন মোটামুটি তিনরকম ভাবে কাজ করে –

১) অবক্ষয়কে মেনে নিয়ে অসহায়তা বোধ করে,

২) অবক্ষয় থেকে দূরে পালিয়ে যাওয়া এবং খরগোশের মতো নিজের মাথা লুকিয়ে রেখে ভাবে যে বিপদ কেটে গেছে,

৩) একা অথবা সদলবলে মিলে সামাজিক অবক্ষয়ের মুখোমুখি হয়ে তা নিরাময় করার চেষ্টা করে।

সর্বশেষ অবস্থাটিই জন্ম দেয় আন্দোলনের। যদিও এই রাস্তা বেঁছে নিয়ে লড়াই করার সদিচ্ছার অভাব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় কিন্তু একমাত্র এই পথের পথিক হলেই তা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিয়ে আসে এবং অতীতেও তাই হয়েছে।

পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের সাথে মানব অস্তিত্বের যোগাযোগ সর্বদা প্রকট। খাদ্য পিরামিডের ধাপগুলো দেখলেই আমরা বুঝতে পারব বিভিন্ন প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাস, জীবনশৈলীর ফলে উপকৃত হয় মানুষও। কিন্তু ক্রমাগত বৃক্ষছেদন, জলাভূমি ভরাট, প্লাস্টিকজাত পদার্থের অতিব্যবহার, কলকারখানার বর্জ্যের পরিকল্পনাহীন নিষ্কাশনের ফলে এই জীববৈচিত্র্য রক্ষা আজ বিপন্ন। যার অনিবার্য পরিণতি পোহাতে হচ্ছে মানুষকেও।

নিজেদের তথা পরিবেশের এই অস্তিত্বের লড়াই কখনো একা বা কখনো দলবদ্ধ মানুষের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে বারংবার। অতীতে ভারতের বন-জঙ্গলের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা বিষ্ণোই আদিবাসী জাতি, যাঁরা প্রায় তিনশো-চারশো বছর আগে রাজস্থানের বুকেই ঘটিয়েছিলেন দেশের প্রথম পরিবেশ আন্দোলন। তারপর এই আদর্শেই উদ্বুদ্ধ হয়ে জন্ম নিয়েছে চিপকো, অ্যাপ্পিক্কোর মতো পরিবেশ আন্দোলন।

বিষ্ণোই সম্প্রদায়:-

“জীব দয়া পালানি” (জীবে দয়া করো)

“রুঁখ লিলা নেহি ঘাভে” (সজীব বৃক্ষ কেটো না)

বিষ্ণোই শব্দটি এসেছে ‘বিশ’ অর্থাৎ ‘২০’ এবং ‘নই’ অর্থাৎ ‘৯’ থেকে, এই সম্প্রদায়ের মানুষ বিষ্ণুর উপাসনার সাথে সাথেই আরোও ২৯টি মতবাদ মেনে চলেন; যার মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে যে ৬টি মতবাদ আছে তার ভেতর ওপরের দু’টো মতবাদ অন্যতম। গুরু জাম্বেশ্বর (১৪৫১-১৫৩৬ খ্রীঃ) ছিলেন এই ২৯টি মতবাদের স্রষ্টা। তিনি ভারত পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়েন এবং ১৪৮৫ সাল নাগাদ একটি সম্প্রদায় গঠন করেন সমরাথাল ডোহরাতে। পরবর্তী ৫১ বছর তিনি নিজের পরিক্রমা এবং ২৯টি তত্ত্বের শিক্ষা সকলের অন্তরে বিলিয়ে দেন। নিঃসন্দেহেই গুরু জাম্বেশ্বর ছিলেন একজন দূরদর্শী মানুষ। পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাবোধের বহু আগে থেকেই তিনি তার দর্শনে-শিক্ষায় পরিবেশকে প্রাধান্য দেন। বর্তমানে উত্তর ও মধ্য ভারত মিলিয়ে এই সম্প্রদায়ের প্রায় ৯,৬০,০০০ মানুষ রয়েছেন। নেপালেও এই মতবাদে বিশ্বাসী মানুষ রয়েছেন। বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ যেভাবে পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তা হয়তো পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম দেয় নি

বিষ্ণোইদের জীবনশৈলী:-

এই সম্প্রদায়ের মানুষ ভীষণ সাধারণ এবং স্বচ্ছ জীবনযাপন করেন। তাদের কিছু নিয়মাবলী হলো-

১) সবুজ গাছে আঘাত করা থেকে বিরত থাকা এবং সমস্ত জীবকূলের প্রতি দয়া করা।

২) শুষ্ক কাঠ সংগ্রহ করে জ্বালানির প্রয়োজন মেটানো। কাঠুরেদেরও অপেক্ষা করতে হবে কোনো গাছ মৃত হওয়া পর্যন্ত। 

৩) বৃষ্টি জল সংরক্ষণের ধারণার বহু আগে থেকেই বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ জলাধার বানিয়েছিল নিজেদের এবং প্রাণীদের জন্যেও।

৪) “অমর রাখভে থাট”- অর্থাৎ আশ্রয়হীন প্রাণীদের সুরক্ষা আর আশ্রয় প্রদান করা।

বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের জন্যেই রাজস্থানের থর মরুভূমির বেশ কিছু অংশে সবুজের সমারোহ দেখা যায়।

বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের পরিবেশ আন্দোলন:-

১৭৩০ সালে সেপ্টেম্বর মাসে যোধপুরের রাজা অভয় সিংহের নতুন রাজপ্রাসাদ নির্মাণের জন্য কাঠের দরকার হলে রাজার সেনারা রাজস্থানের মাড়োয়ার এলাকার খেজরালি গ্রামের (তখন জেহনাদ) খেজুর গাছ কাটতে শুরু করলে গ্রামের এক নারী অমৃতা দেবী তীব্র বিরোধিতা করেন। প্রতিবাদে তিনি গাছেদের জড়িয়ে ধরলে রাজার সৈন্যরা তার শরীর ছিন্নভিন্ন করে দেন। অমৃতা দেবীর তিন সন্তানও গাছেদের জড়িয়ে ধরেন এবং প্রাণ হারান। অমৃতা দেবী এবং তার পরিবারের এই পরিণতি দেখে গ্রামের বাকি বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষেরা এসে গাছেদের জড়িয়ে থাকলে একে একে ৩৬৩ জন বিষ্ণোইদের মুণ্ডচ্ছেদ করে সৈন্যরা। রক্তে লাল হয়ে ওঠে মরুভূমির বালি। রাজার খবর পাওয়ামাত্রই তৎক্ষণাৎ এই হত্যালীলা বন্ধ করতে বলেন। সমগ্র বিষ্ণোই নাগরিকদের প্রতি তিনি ক্ষমা চান এবং তাঁদের এলাকায় অন্য কারোর শিকার করা, গাছ কাটায় স্থগিতাদেশ জারি করে সেটি একটি সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেন যা এখনোও বর্তমান।

বিষ্ণোইদের মতবাদগুলো কয়েকশো বছরের পুরানো হলেও এই যুগেও তা সমান ভাবেই কার্যকর। এই প্রজন্মের বিষ্ণোইরাও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবেশের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব, গুরু জাম্বেশ্বরের শিক্ষা এখনোও পালন করে চলছেন

চিপকো আন্দোলন:-

‘চিপকো’ কথাটির অর্থ হলো ‘জড়িয়ে ধরা’। চিপকো আন্দোলনের অনুপ্রেরণা ছিল বিষ্ণোই আন্দোলন। স্বাধীন ভারতের প্রথম পরিবেশ আন্দোলন ছিল এই চিপকো আন্দোলন। ১৯৭০-এর দিকে উত্তরপ্রদেশের হিমালয়ের পাদদেশে (অধুনা উত্তরাখন্ড) মূলত গ্রামের নারীদের ভেতরেই এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৩ সালে যা তীব্রতা ধারণ করে এবং ভারতের হিমালয়ের পাদদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট জড়িত ১৯৬৩ সালে ঘটে যাওয়া ইন্দো-চিন যুদ্ধের সাথেই। তৎকালীন ভারত সরকার যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন হিমালয়ের প্রত্যন্ত বনাঞ্চলের বুকে উন্নয়নের। কিন্তু এইসমস্ত স্থানে যেসব গ্রামগুলো রয়েছে, সেই গ্রামবাসীদের খাদ্য থেকে জ্বালানি উপাদানসহ নানান প্রয়োজনীয় জিনিসের যোগান দেয় বন-জঙ্গল। সরকারের উন্নয়ন নীতির ফলে এই সমস্ত স্থানের উদ্ভিদের বহুলাংশ কাটা পরে, যার ফলে ভূমি ক্ষয়, জলের উৎস হ্রাস এবং তার সাথে বন্যার প্রকোপ বেড়ে যায়। জঙ্গলের অধিবাসীরা নিজেদের অধিকার হারায়।

১৯৬৪ সালেই গান্ধীবাদী অহিংস আন্দোলনকারী এবং সমাজকর্মী চাঁদি প্রসাদ ভাট্ট দাশোলি গ্রাম স্বরাজ্য সংঘ (পরে বদলে হয় দাশোলি গ্রাম স্বরাজ্য মন্ডল) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭০ সালে শিল্পকারখানার উন্নয়নের ফলে বিপুল বন্যা হয় এবং প্রায় ২০০ জন মানুষ মারা যান। ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে সংঘটিত হয় প্রথম চিপকো আন্দোলনের, স্থান ছিল অলকানন্দা ভ্যালির খানিকটা উপরে অবস্থিত মন্ডল গ্রামের কাছেই। আগুনের ঘৃতাহুতি হয় যখন তৎকালীন সরকার একটি ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারী সংস্থাকে একটি বড়ো অংশের জমি দান করলেও গ্রামের চাষীদের কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরীর জন্য অল্প সংখ্যক গাছ কাটতে দেয় না। সকলে মিলে এই কাজের বিরোধিতা করলেও সরকার যখন তাদের আবেদনে কর্ণপাত করেন না। তখনই চাঁদি প্রসাদ ভট্ট গ্রামবাসীদের জোটবদ্ধ করে জঙ্গলে গিয়ে গাছেদের জড়িয়ে ধরে প্রথম চিপকো আন্দোলনের সূচনা করেন। বহুদিন ব্যাপী এই আন্দোলন চলার পরে সরকার বাধ্য হয়ে এই নীতি প্রত্যাহার করে।

আন্দোলন সফল হলে আরেক গান্ধীবাদী সমাজকর্মী পরিবেশবীদ সুন্দরলাল বহুগুনা এবং স্বরাজ্য সংঘ মিলে হিমালয়ের অন্যান্য সব  পাহাড়ি গ্রামগুলোতে  এই পরিবেশ আন্দোলনের শিখা ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। এরপর ১৯৭৪ সালে রেনি গ্রামে আরেকটি বড়ো পরিবেশ আন্দোলন শুরু হয়। সরকার প্রায় ২০০০ গাছ কেটে ফেলার অনুমতি দেন, গ্রামের পুরুষদের সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়ে। গৌরা দেবীর নেতৃত্বে গ্রামের মহিলারা সবাই একজোট হন, একজোট হন ছাত্ররাও। সম্মিলিত ভাবে তাঁরা জঙ্গলের গাছেদের জড়িয়ে ধরেন এবং সরকারের তরফে আসা গাছ কাটিয়েদের চলে যেতে বাধ্য করেন। গৌরা দেবী এবং তাঁর দলের আন্দোলনের প্রবলতা সরকারকে বাধ্য করে এই সমস্ত গ্রামে সবুজ সম্পদ ধ্বংস করে শিল্পকারখানা তৈরীর ওপর ১০ বছরের স্থগিতাদেশ জারি করার। এভাবেই একটি পরিবেশ আন্দোলন ক্রমে কৃষক এবং নারীদের জঙ্গলের ওপর অধিকার লড়াইয়ের আন্দোলন হিসেবে রূপ নেয়।  ১৯৭৪ সালে সুন্দরলাল বহুগুনা দু’সপ্তাহের জন্য অনশন করেন ফরেস্ট অ্যাক্ট পলিসির সংশোধনের জন্য। ১৯৭৮ সালে পরিবেশকর্মী গাড়োয়াল জেলার তেহরিতে আডবানি জঙ্গল রক্ষার্থে অনশনে বসেন। এই পরিবেশ আন্দোলন সবচেয়ে বড়ো সফলতা পায় যখন ১৯৮০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ১৫ বছরের জন্য উত্তরাখন্ড, হিমাচল এবং সেই সময়ের উত্তরাঞ্চলে বাণিজ্যিক কারণে জঙ্গল ধ্বংসের অনুমতির ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন।

সাইলেন্ট ভ্যালি বাঁচাও আন্দোলন:-

১৯৭৮ সালে শুরু হয় সাইলেন্ট ভ্যালি বাঁচাও পরিবেশ আন্দোলন। কেরালার পালাক্কাড় জেলায় অবস্থিত সাইলেন্ট ভ্যালি এলাকাটি। নানারকম জীবজন্তুর আবাসস্থল এই উপত্যকা। পক্ষী বিশারদ সেলিম আলি, কবি-সমাজকর্মী সুগাথাকুমারিও এই আন্দোলনের সাথে ছিলেন।

১৯৭০ সালে কেরালা ইলেকট্রিসিটি বোর্ড  (KSEB) পরিকল্পনা করে জলবিদ্যুৎ তৈরীর জন্য কুন্ঠিপুজহা নদীতে ড্যাম তৈরী করার। এই নদীটির গতিপথ সাইলেন্ট ভ্যালির মধ্য দিয়ে ছিল, যার ফলে ড্যাম তৈরী করলে ৮.৩ স্কোয়ার কিমি গহীন অরণ্য জলে ডুবে যাবে। সরকারের তরফে দাবি জানানো হয় এই অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ গড়ে উঠলে- ১) সমগ্র কেরালা রাজ্যের বিদ্যুত সমস্যার অনেক সুরাহা হবে, ২) এই বিদ্যুত কেন্দ্রে অনেকেই চাকরি পাবেন যার ফলে বেকারত্বের সমস্যা ঘুঁচবে।

১৯৭১-১৯৭২ সালে নিউইয়র্কের জুলজিক্যাল সোসাইটির একজন বৈজ্ঞানিক স্টিভেন গ্রিন সাইলেন্ট ভ্যালিতে বিলুপ্ত লায়ন-টেইলড লেজের একপ্রকার বিশেষ প্রজাতির বানর খুঁজে পান। একই সময়ে আরেক সরীসৃপ বিশারদ টম হিটেকার সাইলেন্ট ভ্যালিতে বাস করা বিভিন্ন সাপের খোঁজে আসেন। তিনি বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটিতে চিঠি লিখে এই উপত্যকা সংরক্ষণ করতে বলেন।

ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ সালে এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সরকার ২৫কোটি টাকা ঘোষণা করে। আর এই সময় থেকেই আন্দোলন তীব্র হতে শুরু করে।

অক্টোবর ১৯৭৬ সালে জাতীয় পরিবেশ পরিকল্পনা (NCEPC) থেকে একটি কমিটি বসে, যেখানে মেনে নেওয়া হয় এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কথা এবং কমিটি থেকে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার সুপারিশও করা হয়। পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক সংস্থা ক্রমাগত দাবি জোরদার করতে থাকে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে।

তাদের কথা অনুযায়ী, সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী এই প্রকল্পের ফলে সাইলেন্ট ভ্যালির ১০% ক্ষতির কথা আসলে মিথ্যে, বাস্তবে আরোও অনেকটা ক্ষতি হবে। সমস্ত লোয়ার ভ্যালি জলে ডুবে যাবে। প্রকল্প নির্মাণের জন্য এই ভ্যালিতে ধীরে ধীরে জনসমাগম হবে, ইমারত তৈরী হবে যা এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার অনুকুল।

১৯৭৭ সালে সতীশ চন্দ্রন নায়ার সাইলেন্ট ভ্যালি পরিদর্শনে যান এবং তিনি সচেতনতা তৈরী করতে শুরু করেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কেরালা ফরেস্ট রিসার্চ ইন্সটিউটের ভিএস ভিজায়ন এই প্রকল্পের ফলে সাইলেন্ট ভ্যালিতে কতোটা প্রকোপ পড়ার সম্ভাবনা আছে তা নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং অনুরোধ করেন তার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকার যেন কোনোভাবেই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত না নেয়।

এস প্রভাকরণ উত্তর মালাবারের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরতে শুরু করেন, সাধারণ মানুষকে জানাতে শুরু করেন এই প্রকল্পের কুফল সম্পর্কে। প্রফেসর জন জ্যাকব যুব সম্প্রদায়কেও এই আন্দোলনে যুক্ত করেন। সমস্ত কেরালায় আন্দোলনের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্ন ভাবে যে আন্দোলন ঘটছিল ধীরে ধীরে তা আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রকট হয়ে ওঠে।

IUCN এর জেনারেল অ্যাসেম্বলি, পক্ষী বিশারদ সেলিম আলি, সিভি রাধাকৃষ্ণণ, মাধব গারগিল, সিতারাম কেসারি, এম এস স্বামীনাথন, সুব্রাহ্মনিয়ান স্বামী সহ প্রমুখ পরিবেশবিদ ভারত সরকারের কাছে আর্জি পেশ করেন এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তা খারিজ করে দেন এবং নির্দেশ দেন যত শীঘ্র সম্ভব প্রকল্পের কাজ শুরু করতে।

কেরালা সরকার প্রকল্পের কাজ শুরুও করে দেয় ৭৯ সালের জুন মাসে। একই সালের আগস্ট মাসে প্রকৃতি সংস্কার সমিতির এন ভি কৃষ্ণান, প্রফেসর জোসেফ জন, পি গোপালকৃষ্ণন নায়ার কেরালা হাই কোর্টে পিটিশন করে প্রকল্পের কাজে স্থগিতাদেশ আদায় করে নেয়।

সাইলেন্ট ভ্যালি সংস্কার সমিতি এবং কেরালা শাস্ত্র সাহিত্য পরিষদ রাজ্য জুড়ে সাধারণ মানুষের কাছে সবুজ ভ্যালি বাঁচাও আন্দোলন পৌঁছে দেয় কবিতা, গান, গল্প, নাটকের মাধ্যমে। ধীরে ধীরে এই পরিবেশ আন্দোলন জনসাধারণের আন্দোলনে রূপ নেয়।

এর মাঝে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোররাজি দেশাইয়ের বদলে চরণ সিং আসন নেন। তিনি এই বিষয়ে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন।

১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে আন্দোলনকারীদের ছোটো অংশ কেরালা সরকারের কাছে আবেদন জানান যতদিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োজিত কমিটির রিপোর্ট না আসে পৌঁছায় ততদিন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখার। পুরো রাজ্যজুড়ে চলতে থাকে একের পর এক প্রচারকার্য। সেসময়ের অনেক সংবাদ পত্রিকায় এই বিষয়ে লাগাতার রিপোর্ট বেরোতে থাকে।

১৯৮১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জনসাধারণের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সমগ্র সাইলেন্ট গ্রীন ভ্যালিকে সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেন। ভারতের বুকে সফল হয় অন্যতম পরিবেশ আন্দোলন।

জঙ্গল বাঁচাও আন্দোলন:-

১৯৮২ সালে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে বিহারের সিংভূম জেলায়। নেতৃত্ব দেয় সিংভূম জেলার আদিবাসী সম্প্রদায়। প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে ওঠা শাল জঙ্গল শেষ করে তার বদলে দামী টিক গাছ লাগানোর প্রয়াস করে সরকার, যার ফলে যথেচ্ছ ভাবে শাল গাছ কাটা শুরু করলে এই অঞ্চলের আদিবাসীরা সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শুরু করে। অনেকে এই আন্দোলনকে “গ্রিড গেম পলিটিক্যাল পপুলিজম” আখ্যা দিয়েছেন। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন পাশ্ববর্তী রাজ্য ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ে।

অ্যাপ্পিকো আন্দোলন:-

চিপকো আন্দোলন থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৮৩ সাল নাগাদ কর্ণাটকের উত্তর কানাড়া এবং সিমোগা জেলার সিরসি বনাঞ্চলের গাছ কাটার নির্দেশের বিরোধিতায় এই আন্দোলনের সূচনা হয়। অ্যাপ্পিকো পরিবেশ আন্দোলন স্থানীয় ভাবে “অ্যাপ্পিকো চালুভালি” নামেও পরিচিত। চিপকো আন্দোলনে কেবলমাত্র হিমালয় পাদদেশের গ্রামগুলোর জন্য হলেও অ্যাপ্পিকো ছিল সমস্ত পশ্চিমাঘাট এলাকার বন-জঙ্গলের বাণিজ্যিকরণের বিরুদ্ধে এবং আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে। এই পরিবেশ আন্দোলনের আঙ্গিক ছিল অনেকটাই ভিন্ন রকম। এই আন্দোলন বহুলাংশে ছিল সমষ্টিগত মানুষের। তাঁরা গভীর জঙ্গলে হেঁটে যেতেন, পথনাটিকা, গান, আদিবাসী নাচ, স্লাইড শো ইত্যাদির মাধ্যমে বাকি জনসাধারণদের মধ্যে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিতেন। ১৯৮৩ সালে পান্ডুরাম হেগরের নেতৃত্ব এই পরিবেশ আন্দোলন আরোও তীব্রতা পায়।

আন্দোলনকারীরা সাধারণ মানুষকে বোঝান যে দক্ষিণ পশ্চিম ভারতের পশ্চিমাঘাটের সিরসি ট্রপিক্যাল জঙ্গল তাদের জীবনের সাথে কতোটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এই বনভূমি ধ্বংসের ফলে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতিসাধন হবে। ভূমিক্ষয়, জলের স্বাভাবিক উৎস হ্রাস পাবে, যার ফল স্থানীয় মানুষের জীবনেও প্রভাব বিস্তার করবে।

৩৮দিন লাগাতার এই আন্দোলন চলতে থাকে, পরিবেশবিদ পান্ডুরাম হেগরের নেতৃত্বে অনেক স্থানীয় মানুষ গভীর জঙ্গলে গিয়ে গাছেদের জড়িয়ে ধরেন। যার ফলে রাজ্য সরকার বাধ্য হন এই ধ্বংসলীলা বন্ধ করার নির্দেশ দিতে।

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন:-

১৯৮৫ সালে মেধা পাটেকর, কৃষক এবং আদিবাসীদের নেতৃত্বে শুরু হয় নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, যার রেশ এখনোও শেষ হয় নি। নর্মদা নদী মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটের মধ্য দিয়ে প্লাবিত হয়ে আরব সাগরে গিয়ে মিশেছে। ১৯৭৯ সালে ডিসেম্বরে তৎকালীন ভারত সরকার এবং বিশ্ব ব্যাংকের মধ্যে চুক্তি হয় নর্মদা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের। এই চুক্তি অনুযায়ী ৩০ টি বড়ো বাঁধ, ১৩৫ টি মাঝারি এবং ৩০০০ টি ছোটো বাঁধ দেওয়া হবে। যার আনুমানিক খরচ হতে পারে প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা। সরকার তরফে দাবি করা হয় এই প্রজেক্টের ফলে ৪ লক্ষ মানুষ পরিশ্রুত পানীয় জল পাবেন, ৬ লক্ষ হেক্টর জমি পাবে চাষের জল, সমগ্র অঞ্চলের জন্য তৈরি হবে জল বিদ্যুত কেন্দ্র।  এই প্রজেক্টটি ভারতের অর্থনীতি অবস্থার জন্যেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৮০ সালের শুরুর দিকে সরকারের নর্মদা বাঁধ প্রকল্পের বিরুদ্ধে অনেকেই প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে।

১৯৮৫ সালে সরদার সরোবর ড্যামের ব্যাপারে জানতে পেরে মেধা পাটেকর এবং তার সহকর্মীরা সেই স্থান পর্যবক্ষেণ করতে আসেন। তাঁরা গিয়ে লক্ষ্য করেন যে বাঁধ নির্মাণের ফলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তাদের পুরোপুরি ধোঁয়াশার ভেতরে রাখা হয়েছে। তিনি সেই সমস্ত গ্রামবাসী, আদিবাসীদের নিয়ে মধ্যপ্রদেশ থেকে ৩৬ দিনের পদযাত্রা করে সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণের জায়গায় এসে পৌঁছান।

১৯৮৭ সালে সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। পরিবেশবিদদের মতে এই ড্যাম তৈরি হলে – লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হবেন, হাজার হাজার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনে প্রভাব পড়বে, ১৫০ টির বেশি গ্রাম জলের নীচে চলে যাবে, নদী নিজের নাব্যতা হারিয়ে ফেলবে। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হলে নদীতীরে ভাঙন দেখা দেবে।

১৯৯০ সালে বাবা আমতেও এই আন্দোলনে যোগদান করে আমরণ ধর্নায় বসেন। আমির খান, অরুন্ধতী রায়ও এই আন্দোলনের সাথে ছিলেন। ১৯৯৩ সালে বিশ্ব ব্যাংক এই প্রজেক্ট থেকে সরে দাঁড়ায়। ১৯৯৪ সালে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন অফিস এবং প্রতিবাদীদের আক্রমণ করা হয়। মেধা পাটেকর একাধিকবার জেলে যান, আক্রান্ত হন। প্রতিবাদের মেধা পাটেকর ২০ দিনের অনশনে বসলে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে বল প্রয়োগে খাবার খাওয়ায়।

১৯৯৫ সালে কোর্ট এই বাঁধ নির্মাণে স্থগিতাদেশ জারি করে।

কিন্তু ১৯৯৯ সালে সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণ পুনরায় শুরু হয় এবং ২০০৬ সালে শেষ হয়। সমগ্র প্রজেক্টটি ২০২৫ নাগাদ শেষ হবে। এই বাঁধের জন্য ১৭৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়, ১০ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে, পরিবেশের সমূহ ক্ষতি হয়।

আন্দোলনের সফলতা:-

এই আন্দোলন নর্মদার বুকে বাধ নির্মাণ ঠেকাতে না পারলেও নিজস্ব কিছু সফলতা লাভ করেছিল। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের ভীষণ উজ্জ্বল ছাপ রেখেছিল। বাঁধের ফলে প্রভাবিত মানুষের সুবিধার্থে সরকার তাদের নানা সুবিধে দিয়েছিল। বিশ্ব ব্যাংকের সমর্থন তুলে নেওয়াও এই আন্দোলনের একটি নৈতিক জয়।

উপসংহার:-

তেহারি ড্যাম, নমামি গঙ্গের মতো আন্দোলনে বিখ্যাত মুখ থাকলেও সেগুলো অসফল হয়। আমাদের দেশের পরিবেশ আন্দোলন অসফল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো- রাষ্ট্রের কাছে ভারতের জনতার জীবন মূল্য অনেক কম, ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করলে বছরের পর বছর সেই কেস কোর্টে চলতে থাকে। রাজ্য সরকারের পরিবেশ সংক্রান্ত আইন ভীষণ দুর্বল। আর বেশীর ভাগ সময়েই দেখা যায় সাধারণ মানুষ এই পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে জানেন না। সমাজের উঁচু স্তরের শিক্ষিত পরিবেশবিদ এবং একজন সাধারণ ভারতীয় নাগরিকের মাঝে কথোপকথনের অভাব থাকে।  যার ফলে অনেক সময় দেখা যায় সাধারণ মানুষ পরিবেশ আন্দোলনে যোগদান করে না। তবে মানুষ অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন। দক্ষিণ কলকাতার যশোর রোডের প্রাচীন গাছেদের বাঁচাতেও আবালবৃদ্ধবনিতা রাস্তায় নেমেছিলেন। মুম্বাইয়ের আরে জঙ্গল রক্ষার্থে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘হিউম্যান চেইন’। অরুণাচলের বায়োস্ফিয়ার বনাঞ্চল দিহং পাটকাই এলাকাতে কয়লা উত্তোলন করতে এলে পরিবেশবিদ এবং সাধারণ মানুষেরাও তীব্র বিরোধিতা করছে। এইভাবেই একদিন মানুষ শিখে যাবেন পরিবেশের গুরুত্ব, প্রকৃতির মাহাত্ম্য। মানব জাতির অস্তিত্বের জন্য এই প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান দরকারি। 

Nature Talkies declaration: This content is written by the contributor. If you have any suggestion or want to update more information or report us then contact at : info@naturetalkies.com

Continue Reading

Trending