পরিবেশ আন্দোলন এবং ভারতের বুকে তার বিস্তার - We Talk about Nature spankbang xxnx porncuze porn800.me
Connect with us

Bengali Edition

পরিবেশ আন্দোলন এবং ভারতের বুকে তার বিস্তার

Published

on

পরিবেশ আন্দোলন
Image Credit : Pixabay (doodlartdotcom )
Share This Article

মানুষের সাথে পরিবেশের যোগসূত্র আদিকাল থেকেই। প্রকৃতিই আমাদের দান করছে অক্সিজেন থেকে শুরু করে পরিধেয় বস্তু, খাদ্যসহ বিভিন্ন জীবনের রসদ। মানব সমাজ যে চিরকাল একতরফা ভাবে কেবল গ্রহণই করে গেছে তা নয়, পরিবেশ রক্ষার্থে নিজের জীবনও উৎসর্গ করেছেন বিভিন্ন সময়ে। আজ “পরিবেশ আন্দোলন”- এর কথা মাথায় এলেই আমাদের মনে পড়ে পশ্চিমা দেশে ঘটে যাওয়া ভিন্ন ভিন্ন আন্দোলনের কথা। মনে পড়ে ১৯৫৬ সালে জ্যাকিউস কস্টিউয়ের বিতর্কিত ডকুমেন্টারি সিনেমা দ্যা সাইলেন্ট ওয়ার্ল্ড। মনে পড়ে ১৯৬২ সালে র‍্যাচেল করসনের অন্যতম বই সাইলেন্ট স্প্রিং। ১৯৫০ থেকে ১৯৬২ সাল ইউনাইটেড স্টেটসে যে বিপুল পরিমাণ ডিডিটি এবং কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছিল তাকে কঠোরভাবে আক্রমণ করা হয় এই বইতে। পুঁজিপতিদের বিরোধিতা সত্ত্বেও এই বইয়ের প্রতিটি কথা সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং ধরা হয় আধুনিক যুগের পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম অনুঘটক এই বইটি। যার ফলস্বরূপ ১৯৭২ সাল থেকে ইউএসএতে ডিডিটি ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই বছরেই ইউনাইটেড নেশনস ৫ই জুনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশগুলোর ভেতর পরিবেশ নিয়ে এই আলোড়নের অনেক আগেই এবং তাদের সমসাময়িক সময়েও আমাদের দেশে ঘটে গিয়েছে একের পর এক পরিবেশ আন্দোলন। অষ্টাদশ শতকে বিষ্ণোই আন্দোলন থেকেই সূচনা হয়েছিল ভারতের বুকে একাধিক পরিবেশ আন্দোলন।

পরিবেশ আন্দোলন কী এবং কেন:-

যখনই জনগণের একাংশ কোনো সামাজিক অবক্ষয়ের মুখোমুখি হয় তখন মানব মনস্তাত্ত্বিক গঠন মোটামুটি তিনরকম ভাবে কাজ করে –

১) অবক্ষয়কে মেনে নিয়ে অসহায়তা বোধ করে,

২) অবক্ষয় থেকে দূরে পালিয়ে যাওয়া এবং খরগোশের মতো নিজের মাথা লুকিয়ে রেখে ভাবে যে বিপদ কেটে গেছে,

৩) একা অথবা সদলবলে মিলে সামাজিক অবক্ষয়ের মুখোমুখি হয়ে তা নিরাময় করার চেষ্টা করে।

সর্বশেষ অবস্থাটিই জন্ম দেয় আন্দোলনের। যদিও এই রাস্তা বেঁছে নিয়ে লড়াই করার সদিচ্ছার অভাব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় কিন্তু একমাত্র এই পথের পথিক হলেই তা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিয়ে আসে এবং অতীতেও তাই হয়েছে।

পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের সাথে মানব অস্তিত্বের যোগাযোগ সর্বদা প্রকট। খাদ্য পিরামিডের ধাপগুলো দেখলেই আমরা বুঝতে পারব বিভিন্ন প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাস, জীবনশৈলীর ফলে উপকৃত হয় মানুষও। কিন্তু ক্রমাগত বৃক্ষছেদন, জলাভূমি ভরাট, প্লাস্টিকজাত পদার্থের অতিব্যবহার, কলকারখানার বর্জ্যের পরিকল্পনাহীন নিষ্কাশনের ফলে এই জীববৈচিত্র্য রক্ষা আজ বিপন্ন। যার অনিবার্য পরিণতি পোহাতে হচ্ছে মানুষকেও।

নিজেদের তথা পরিবেশের এই অস্তিত্বের লড়াই কখনো একা বা কখনো দলবদ্ধ মানুষের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে বারংবার। অতীতে ভারতের বন-জঙ্গলের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা বিষ্ণোই আদিবাসী জাতি, যাঁরা প্রায় তিনশো-চারশো বছর আগে রাজস্থানের বুকেই ঘটিয়েছিলেন দেশের প্রথম পরিবেশ আন্দোলন। তারপর এই আদর্শেই উদ্বুদ্ধ হয়ে জন্ম নিয়েছে চিপকো, অ্যাপ্পিক্কোর মতো পরিবেশ আন্দোলন।

বিষ্ণোই সম্প্রদায়:-

“জীব দয়া পালানি” (জীবে দয়া করো)

“রুঁখ লিলা নেহি ঘাভে” (সজীব বৃক্ষ কেটো না)

বিষ্ণোই শব্দটি এসেছে ‘বিশ’ অর্থাৎ ‘২০’ এবং ‘নই’ অর্থাৎ ‘৯’ থেকে, এই সম্প্রদায়ের মানুষ বিষ্ণুর উপাসনার সাথে সাথেই আরোও ২৯টি মতবাদ মেনে চলেন; যার মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে যে ৬টি মতবাদ আছে তার ভেতর ওপরের দু’টো মতবাদ অন্যতম। গুরু জাম্বেশ্বর (১৪৫১-১৫৩৬ খ্রীঃ) ছিলেন এই ২৯টি মতবাদের স্রষ্টা। তিনি ভারত পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়েন এবং ১৪৮৫ সাল নাগাদ একটি সম্প্রদায় গঠন করেন সমরাথাল ডোহরাতে। পরবর্তী ৫১ বছর তিনি নিজের পরিক্রমা এবং ২৯টি তত্ত্বের শিক্ষা সকলের অন্তরে বিলিয়ে দেন। নিঃসন্দেহেই গুরু জাম্বেশ্বর ছিলেন একজন দূরদর্শী মানুষ। পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাবোধের বহু আগে থেকেই তিনি তার দর্শনে-শিক্ষায় পরিবেশকে প্রাধান্য দেন। বর্তমানে উত্তর ও মধ্য ভারত মিলিয়ে এই সম্প্রদায়ের প্রায় ৯,৬০,০০০ মানুষ রয়েছেন। নেপালেও এই মতবাদে বিশ্বাসী মানুষ রয়েছেন। বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ যেভাবে পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তা হয়তো পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম দেয় নি

বিষ্ণোইদের জীবনশৈলী:-

এই সম্প্রদায়ের মানুষ ভীষণ সাধারণ এবং স্বচ্ছ জীবনযাপন করেন। তাদের কিছু নিয়মাবলী হলো-

১) সবুজ গাছে আঘাত করা থেকে বিরত থাকা এবং সমস্ত জীবকূলের প্রতি দয়া করা।

২) শুষ্ক কাঠ সংগ্রহ করে জ্বালানির প্রয়োজন মেটানো। কাঠুরেদেরও অপেক্ষা করতে হবে কোনো গাছ মৃত হওয়া পর্যন্ত। 

৩) বৃষ্টি জল সংরক্ষণের ধারণার বহু আগে থেকেই বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ জলাধার বানিয়েছিল নিজেদের এবং প্রাণীদের জন্যেও।

৪) “অমর রাখভে থাট”- অর্থাৎ আশ্রয়হীন প্রাণীদের সুরক্ষা আর আশ্রয় প্রদান করা।

বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের জন্যেই রাজস্থানের থর মরুভূমির বেশ কিছু অংশে সবুজের সমারোহ দেখা যায়।

বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের পরিবেশ আন্দোলন:-

১৭৩০ সালে সেপ্টেম্বর মাসে যোধপুরের রাজা অভয় সিংহের নতুন রাজপ্রাসাদ নির্মাণের জন্য কাঠের দরকার হলে রাজার সেনারা রাজস্থানের মাড়োয়ার এলাকার খেজরালি গ্রামের (তখন জেহনাদ) খেজুর গাছ কাটতে শুরু করলে গ্রামের এক নারী অমৃতা দেবী তীব্র বিরোধিতা করেন। প্রতিবাদে তিনি গাছেদের জড়িয়ে ধরলে রাজার সৈন্যরা তার শরীর ছিন্নভিন্ন করে দেন। অমৃতা দেবীর তিন সন্তানও গাছেদের জড়িয়ে ধরেন এবং প্রাণ হারান। অমৃতা দেবী এবং তার পরিবারের এই পরিণতি দেখে গ্রামের বাকি বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষেরা এসে গাছেদের জড়িয়ে থাকলে একে একে ৩৬৩ জন বিষ্ণোইদের মুণ্ডচ্ছেদ করে সৈন্যরা। রক্তে লাল হয়ে ওঠে মরুভূমির বালি। রাজার খবর পাওয়ামাত্রই তৎক্ষণাৎ এই হত্যালীলা বন্ধ করতে বলেন। সমগ্র বিষ্ণোই নাগরিকদের প্রতি তিনি ক্ষমা চান এবং তাঁদের এলাকায় অন্য কারোর শিকার করা, গাছ কাটায় স্থগিতাদেশ জারি করে সেটি একটি সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করেন যা এখনোও বর্তমান।

বিষ্ণোইদের মতবাদগুলো কয়েকশো বছরের পুরানো হলেও এই যুগেও তা সমান ভাবেই কার্যকর। এই প্রজন্মের বিষ্ণোইরাও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবেশের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব, গুরু জাম্বেশ্বরের শিক্ষা এখনোও পালন করে চলছেন

চিপকো আন্দোলন:-

‘চিপকো’ কথাটির অর্থ হলো ‘জড়িয়ে ধরা’। চিপকো আন্দোলনের অনুপ্রেরণা ছিল বিষ্ণোই আন্দোলন। স্বাধীন ভারতের প্রথম পরিবেশ আন্দোলন ছিল এই চিপকো আন্দোলন। ১৯৭০-এর দিকে উত্তরপ্রদেশের হিমালয়ের পাদদেশে (অধুনা উত্তরাখন্ড) মূলত গ্রামের নারীদের ভেতরেই এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৩ সালে যা তীব্রতা ধারণ করে এবং ভারতের হিমালয়ের পাদদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট জড়িত ১৯৬৩ সালে ঘটে যাওয়া ইন্দো-চিন যুদ্ধের সাথেই। তৎকালীন ভারত সরকার যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন হিমালয়ের প্রত্যন্ত বনাঞ্চলের বুকে উন্নয়নের। কিন্তু এইসমস্ত স্থানে যেসব গ্রামগুলো রয়েছে, সেই গ্রামবাসীদের খাদ্য থেকে জ্বালানি উপাদানসহ নানান প্রয়োজনীয় জিনিসের যোগান দেয় বন-জঙ্গল। সরকারের উন্নয়ন নীতির ফলে এই সমস্ত স্থানের উদ্ভিদের বহুলাংশ কাটা পরে, যার ফলে ভূমি ক্ষয়, জলের উৎস হ্রাস এবং তার সাথে বন্যার প্রকোপ বেড়ে যায়। জঙ্গলের অধিবাসীরা নিজেদের অধিকার হারায়।

১৯৬৪ সালেই গান্ধীবাদী অহিংস আন্দোলনকারী এবং সমাজকর্মী চাঁদি প্রসাদ ভাট্ট দাশোলি গ্রাম স্বরাজ্য সংঘ (পরে বদলে হয় দাশোলি গ্রাম স্বরাজ্য মন্ডল) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭০ সালে শিল্পকারখানার উন্নয়নের ফলে বিপুল বন্যা হয় এবং প্রায় ২০০ জন মানুষ মারা যান। ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে সংঘটিত হয় প্রথম চিপকো আন্দোলনের, স্থান ছিল অলকানন্দা ভ্যালির খানিকটা উপরে অবস্থিত মন্ডল গ্রামের কাছেই। আগুনের ঘৃতাহুতি হয় যখন তৎকালীন সরকার একটি ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারী সংস্থাকে একটি বড়ো অংশের জমি দান করলেও গ্রামের চাষীদের কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরীর জন্য অল্প সংখ্যক গাছ কাটতে দেয় না। সকলে মিলে এই কাজের বিরোধিতা করলেও সরকার যখন তাদের আবেদনে কর্ণপাত করেন না। তখনই চাঁদি প্রসাদ ভট্ট গ্রামবাসীদের জোটবদ্ধ করে জঙ্গলে গিয়ে গাছেদের জড়িয়ে ধরে প্রথম চিপকো আন্দোলনের সূচনা করেন। বহুদিন ব্যাপী এই আন্দোলন চলার পরে সরকার বাধ্য হয়ে এই নীতি প্রত্যাহার করে।

আন্দোলন সফল হলে আরেক গান্ধীবাদী সমাজকর্মী পরিবেশবীদ সুন্দরলাল বহুগুনা এবং স্বরাজ্য সংঘ মিলে হিমালয়ের অন্যান্য সব  পাহাড়ি গ্রামগুলোতে  এই পরিবেশ আন্দোলনের শিখা ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন। এরপর ১৯৭৪ সালে রেনি গ্রামে আরেকটি বড়ো পরিবেশ আন্দোলন শুরু হয়। সরকার প্রায় ২০০০ গাছ কেটে ফেলার অনুমতি দেন, গ্রামের পুরুষদের সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়ে। গৌরা দেবীর নেতৃত্বে গ্রামের মহিলারা সবাই একজোট হন, একজোট হন ছাত্ররাও। সম্মিলিত ভাবে তাঁরা জঙ্গলের গাছেদের জড়িয়ে ধরেন এবং সরকারের তরফে আসা গাছ কাটিয়েদের চলে যেতে বাধ্য করেন। গৌরা দেবী এবং তাঁর দলের আন্দোলনের প্রবলতা সরকারকে বাধ্য করে এই সমস্ত গ্রামে সবুজ সম্পদ ধ্বংস করে শিল্পকারখানা তৈরীর ওপর ১০ বছরের স্থগিতাদেশ জারি করার। এভাবেই একটি পরিবেশ আন্দোলন ক্রমে কৃষক এবং নারীদের জঙ্গলের ওপর অধিকার লড়াইয়ের আন্দোলন হিসেবে রূপ নেয়।  ১৯৭৪ সালে সুন্দরলাল বহুগুনা দু’সপ্তাহের জন্য অনশন করেন ফরেস্ট অ্যাক্ট পলিসির সংশোধনের জন্য। ১৯৭৮ সালে পরিবেশকর্মী গাড়োয়াল জেলার তেহরিতে আডবানি জঙ্গল রক্ষার্থে অনশনে বসেন। এই পরিবেশ আন্দোলন সবচেয়ে বড়ো সফলতা পায় যখন ১৯৮০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ১৫ বছরের জন্য উত্তরাখন্ড, হিমাচল এবং সেই সময়ের উত্তরাঞ্চলে বাণিজ্যিক কারণে জঙ্গল ধ্বংসের অনুমতির ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন।

সাইলেন্ট ভ্যালি বাঁচাও আন্দোলন:-

১৯৭৮ সালে শুরু হয় সাইলেন্ট ভ্যালি বাঁচাও পরিবেশ আন্দোলন। কেরালার পালাক্কাড় জেলায় অবস্থিত সাইলেন্ট ভ্যালি এলাকাটি। নানারকম জীবজন্তুর আবাসস্থল এই উপত্যকা। পক্ষী বিশারদ সেলিম আলি, কবি-সমাজকর্মী সুগাথাকুমারিও এই আন্দোলনের সাথে ছিলেন।

১৯৭০ সালে কেরালা ইলেকট্রিসিটি বোর্ড  (KSEB) পরিকল্পনা করে জলবিদ্যুৎ তৈরীর জন্য কুন্ঠিপুজহা নদীতে ড্যাম তৈরী করার। এই নদীটির গতিপথ সাইলেন্ট ভ্যালির মধ্য দিয়ে ছিল, যার ফলে ড্যাম তৈরী করলে ৮.৩ স্কোয়ার কিমি গহীন অরণ্য জলে ডুবে যাবে। সরকারের তরফে দাবি জানানো হয় এই অঞ্চলে জলবিদ্যুৎ গড়ে উঠলে- ১) সমগ্র কেরালা রাজ্যের বিদ্যুত সমস্যার অনেক সুরাহা হবে, ২) এই বিদ্যুত কেন্দ্রে অনেকেই চাকরি পাবেন যার ফলে বেকারত্বের সমস্যা ঘুঁচবে।

১৯৭১-১৯৭২ সালে নিউইয়র্কের জুলজিক্যাল সোসাইটির একজন বৈজ্ঞানিক স্টিভেন গ্রিন সাইলেন্ট ভ্যালিতে বিলুপ্ত লায়ন-টেইলড লেজের একপ্রকার বিশেষ প্রজাতির বানর খুঁজে পান। একই সময়ে আরেক সরীসৃপ বিশারদ টম হিটেকার সাইলেন্ট ভ্যালিতে বাস করা বিভিন্ন সাপের খোঁজে আসেন। তিনি বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটিতে চিঠি লিখে এই উপত্যকা সংরক্ষণ করতে বলেন।

ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ সালে এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য সরকার ২৫কোটি টাকা ঘোষণা করে। আর এই সময় থেকেই আন্দোলন তীব্র হতে শুরু করে।

অক্টোবর ১৯৭৬ সালে জাতীয় পরিবেশ পরিকল্পনা (NCEPC) থেকে একটি কমিটি বসে, যেখানে মেনে নেওয়া হয় এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কথা এবং কমিটি থেকে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার সুপারিশও করা হয়। পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেক সংস্থা ক্রমাগত দাবি জোরদার করতে থাকে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে।

তাদের কথা অনুযায়ী, সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী এই প্রকল্পের ফলে সাইলেন্ট ভ্যালির ১০% ক্ষতির কথা আসলে মিথ্যে, বাস্তবে আরোও অনেকটা ক্ষতি হবে। সমস্ত লোয়ার ভ্যালি জলে ডুবে যাবে। প্রকল্প নির্মাণের জন্য এই ভ্যালিতে ধীরে ধীরে জনসমাগম হবে, ইমারত তৈরী হবে যা এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার অনুকুল।

১৯৭৭ সালে সতীশ চন্দ্রন নায়ার সাইলেন্ট ভ্যালি পরিদর্শনে যান এবং তিনি সচেতনতা তৈরী করতে শুরু করেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কেরালা ফরেস্ট রিসার্চ ইন্সটিউটের ভিএস ভিজায়ন এই প্রকল্পের ফলে সাইলেন্ট ভ্যালিতে কতোটা প্রকোপ পড়ার সম্ভাবনা আছে তা নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং অনুরোধ করেন তার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকার যেন কোনোভাবেই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত না নেয়।

এস প্রভাকরণ উত্তর মালাবারের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে ঘুরতে শুরু করেন, সাধারণ মানুষকে জানাতে শুরু করেন এই প্রকল্পের কুফল সম্পর্কে। প্রফেসর জন জ্যাকব যুব সম্প্রদায়কেও এই আন্দোলনে যুক্ত করেন। সমস্ত কেরালায় আন্দোলনের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্ন ভাবে যে আন্দোলন ঘটছিল ধীরে ধীরে তা আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রকট হয়ে ওঠে।

IUCN এর জেনারেল অ্যাসেম্বলি, পক্ষী বিশারদ সেলিম আলি, সিভি রাধাকৃষ্ণণ, মাধব গারগিল, সিতারাম কেসারি, এম এস স্বামীনাথন, সুব্রাহ্মনিয়ান স্বামী সহ প্রমুখ পরিবেশবিদ ভারত সরকারের কাছে আর্জি পেশ করেন এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তা খারিজ করে দেন এবং নির্দেশ দেন যত শীঘ্র সম্ভব প্রকল্পের কাজ শুরু করতে।

কেরালা সরকার প্রকল্পের কাজ শুরুও করে দেয় ৭৯ সালের জুন মাসে। একই সালের আগস্ট মাসে প্রকৃতি সংস্কার সমিতির এন ভি কৃষ্ণান, প্রফেসর জোসেফ জন, পি গোপালকৃষ্ণন নায়ার কেরালা হাই কোর্টে পিটিশন করে প্রকল্পের কাজে স্থগিতাদেশ আদায় করে নেয়।

সাইলেন্ট ভ্যালি সংস্কার সমিতি এবং কেরালা শাস্ত্র সাহিত্য পরিষদ রাজ্য জুড়ে সাধারণ মানুষের কাছে সবুজ ভ্যালি বাঁচাও আন্দোলন পৌঁছে দেয় কবিতা, গান, গল্প, নাটকের মাধ্যমে। ধীরে ধীরে এই পরিবেশ আন্দোলন জনসাধারণের আন্দোলনে রূপ নেয়।

এর মাঝে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোররাজি দেশাইয়ের বদলে চরণ সিং আসন নেন। তিনি এই বিষয়ে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন।

১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে আন্দোলনকারীদের ছোটো অংশ কেরালা সরকারের কাছে আবেদন জানান যতদিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োজিত কমিটির রিপোর্ট না আসে পৌঁছায় ততদিন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখার। পুরো রাজ্যজুড়ে চলতে থাকে একের পর এক প্রচারকার্য। সেসময়ের অনেক সংবাদ পত্রিকায় এই বিষয়ে লাগাতার রিপোর্ট বেরোতে থাকে।

১৯৮১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জনসাধারণের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সমগ্র সাইলেন্ট গ্রীন ভ্যালিকে সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেন। ভারতের বুকে সফল হয় অন্যতম পরিবেশ আন্দোলন।

জঙ্গল বাঁচাও আন্দোলন:-

১৯৮২ সালে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে বিহারের সিংভূম জেলায়। নেতৃত্ব দেয় সিংভূম জেলার আদিবাসী সম্প্রদায়। প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে ওঠা শাল জঙ্গল শেষ করে তার বদলে দামী টিক গাছ লাগানোর প্রয়াস করে সরকার, যার ফলে যথেচ্ছ ভাবে শাল গাছ কাটা শুরু করলে এই অঞ্চলের আদিবাসীরা সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শুরু করে। অনেকে এই আন্দোলনকে “গ্রিড গেম পলিটিক্যাল পপুলিজম” আখ্যা দিয়েছেন। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন পাশ্ববর্তী রাজ্য ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ে।

অ্যাপ্পিকো আন্দোলন:-

চিপকো আন্দোলন থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৮৩ সাল নাগাদ কর্ণাটকের উত্তর কানাড়া এবং সিমোগা জেলার সিরসি বনাঞ্চলের গাছ কাটার নির্দেশের বিরোধিতায় এই আন্দোলনের সূচনা হয়। অ্যাপ্পিকো পরিবেশ আন্দোলন স্থানীয় ভাবে “অ্যাপ্পিকো চালুভালি” নামেও পরিচিত। চিপকো আন্দোলনে কেবলমাত্র হিমালয় পাদদেশের গ্রামগুলোর জন্য হলেও অ্যাপ্পিকো ছিল সমস্ত পশ্চিমাঘাট এলাকার বন-জঙ্গলের বাণিজ্যিকরণের বিরুদ্ধে এবং আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে। এই পরিবেশ আন্দোলনের আঙ্গিক ছিল অনেকটাই ভিন্ন রকম। এই আন্দোলন বহুলাংশে ছিল সমষ্টিগত মানুষের। তাঁরা গভীর জঙ্গলে হেঁটে যেতেন, পথনাটিকা, গান, আদিবাসী নাচ, স্লাইড শো ইত্যাদির মাধ্যমে বাকি জনসাধারণদের মধ্যে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিতেন। ১৯৮৩ সালে পান্ডুরাম হেগরের নেতৃত্ব এই পরিবেশ আন্দোলন আরোও তীব্রতা পায়।

আন্দোলনকারীরা সাধারণ মানুষকে বোঝান যে দক্ষিণ পশ্চিম ভারতের পশ্চিমাঘাটের সিরসি ট্রপিক্যাল জঙ্গল তাদের জীবনের সাথে কতোটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এই বনভূমি ধ্বংসের ফলে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতিসাধন হবে। ভূমিক্ষয়, জলের স্বাভাবিক উৎস হ্রাস পাবে, যার ফল স্থানীয় মানুষের জীবনেও প্রভাব বিস্তার করবে।

৩৮দিন লাগাতার এই আন্দোলন চলতে থাকে, পরিবেশবিদ পান্ডুরাম হেগরের নেতৃত্বে অনেক স্থানীয় মানুষ গভীর জঙ্গলে গিয়ে গাছেদের জড়িয়ে ধরেন। যার ফলে রাজ্য সরকার বাধ্য হন এই ধ্বংসলীলা বন্ধ করার নির্দেশ দিতে।

নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন:-

১৯৮৫ সালে মেধা পাটেকর, কৃষক এবং আদিবাসীদের নেতৃত্বে শুরু হয় নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, যার রেশ এখনোও শেষ হয় নি। নর্মদা নদী মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটের মধ্য দিয়ে প্লাবিত হয়ে আরব সাগরে গিয়ে মিশেছে। ১৯৭৯ সালে ডিসেম্বরে তৎকালীন ভারত সরকার এবং বিশ্ব ব্যাংকের মধ্যে চুক্তি হয় নর্মদা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের। এই চুক্তি অনুযায়ী ৩০ টি বড়ো বাঁধ, ১৩৫ টি মাঝারি এবং ৩০০০ টি ছোটো বাঁধ দেওয়া হবে। যার আনুমানিক খরচ হতে পারে প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা। সরকার তরফে দাবি করা হয় এই প্রজেক্টের ফলে ৪ লক্ষ মানুষ পরিশ্রুত পানীয় জল পাবেন, ৬ লক্ষ হেক্টর জমি পাবে চাষের জল, সমগ্র অঞ্চলের জন্য তৈরি হবে জল বিদ্যুত কেন্দ্র।  এই প্রজেক্টটি ভারতের অর্থনীতি অবস্থার জন্যেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৮০ সালের শুরুর দিকে সরকারের নর্মদা বাঁধ প্রকল্পের বিরুদ্ধে অনেকেই প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে।

১৯৮৫ সালে সরদার সরোবর ড্যামের ব্যাপারে জানতে পেরে মেধা পাটেকর এবং তার সহকর্মীরা সেই স্থান পর্যবক্ষেণ করতে আসেন। তাঁরা গিয়ে লক্ষ্য করেন যে বাঁধ নির্মাণের ফলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তাদের পুরোপুরি ধোঁয়াশার ভেতরে রাখা হয়েছে। তিনি সেই সমস্ত গ্রামবাসী, আদিবাসীদের নিয়ে মধ্যপ্রদেশ থেকে ৩৬ দিনের পদযাত্রা করে সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণের জায়গায় এসে পৌঁছান।

১৯৮৭ সালে সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। পরিবেশবিদদের মতে এই ড্যাম তৈরি হলে – লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হবেন, হাজার হাজার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনে প্রভাব পড়বে, ১৫০ টির বেশি গ্রাম জলের নীচে চলে যাবে, নদী নিজের নাব্যতা হারিয়ে ফেলবে। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হলে নদীতীরে ভাঙন দেখা দেবে।

১৯৯০ সালে বাবা আমতেও এই আন্দোলনে যোগদান করে আমরণ ধর্নায় বসেন। আমির খান, অরুন্ধতী রায়ও এই আন্দোলনের সাথে ছিলেন। ১৯৯৩ সালে বিশ্ব ব্যাংক এই প্রজেক্ট থেকে সরে দাঁড়ায়। ১৯৯৪ সালে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন অফিস এবং প্রতিবাদীদের আক্রমণ করা হয়। মেধা পাটেকর একাধিকবার জেলে যান, আক্রান্ত হন। প্রতিবাদের মেধা পাটেকর ২০ দিনের অনশনে বসলে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে বল প্রয়োগে খাবার খাওয়ায়।

১৯৯৫ সালে কোর্ট এই বাঁধ নির্মাণে স্থগিতাদেশ জারি করে।

কিন্তু ১৯৯৯ সালে সর্দার সরোবর বাঁধ নির্মাণ পুনরায় শুরু হয় এবং ২০০৬ সালে শেষ হয়। সমগ্র প্রজেক্টটি ২০২৫ নাগাদ শেষ হবে। এই বাঁধের জন্য ১৭৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়, ১০ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে, পরিবেশের সমূহ ক্ষতি হয়।

আন্দোলনের সফলতা:-

এই আন্দোলন নর্মদার বুকে বাধ নির্মাণ ঠেকাতে না পারলেও নিজস্ব কিছু সফলতা লাভ করেছিল। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের ভীষণ উজ্জ্বল ছাপ রেখেছিল। বাঁধের ফলে প্রভাবিত মানুষের সুবিধার্থে সরকার তাদের নানা সুবিধে দিয়েছিল। বিশ্ব ব্যাংকের সমর্থন তুলে নেওয়াও এই আন্দোলনের একটি নৈতিক জয়।

উপসংহার:-

তেহারি ড্যাম, নমামি গঙ্গের মতো আন্দোলনে বিখ্যাত মুখ থাকলেও সেগুলো অসফল হয়। আমাদের দেশের পরিবেশ আন্দোলন অসফল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো- রাষ্ট্রের কাছে ভারতের জনতার জীবন মূল্য অনেক কম, ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করলে বছরের পর বছর সেই কেস কোর্টে চলতে থাকে। রাজ্য সরকারের পরিবেশ সংক্রান্ত আইন ভীষণ দুর্বল। আর বেশীর ভাগ সময়েই দেখা যায় সাধারণ মানুষ এই পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে জানেন না। সমাজের উঁচু স্তরের শিক্ষিত পরিবেশবিদ এবং একজন সাধারণ ভারতীয় নাগরিকের মাঝে কথোপকথনের অভাব থাকে।  যার ফলে অনেক সময় দেখা যায় সাধারণ মানুষ পরিবেশ আন্দোলনে যোগদান করে না। তবে মানুষ অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন। দক্ষিণ কলকাতার যশোর রোডের প্রাচীন গাছেদের বাঁচাতেও আবালবৃদ্ধবনিতা রাস্তায় নেমেছিলেন। মুম্বাইয়ের আরে জঙ্গল রক্ষার্থে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘হিউম্যান চেইন’। অরুণাচলের বায়োস্ফিয়ার বনাঞ্চল দিহং পাটকাই এলাকাতে কয়লা উত্তোলন করতে এলে পরিবেশবিদ এবং সাধারণ মানুষেরাও তীব্র বিরোধিতা করছে। এইভাবেই একদিন মানুষ শিখে যাবেন পরিবেশের গুরুত্ব, প্রকৃতির মাহাত্ম্য। মানব জাতির অস্তিত্বের জন্য এই প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান দরকারি। 

Nature Talkies declaration: This content is written by the contributor. If you have any suggestion or want to update more information or report us then contact at : info@naturetalkies.com

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Bengali Edition

বরন্তিঃ ছবির মতো সাজানো পুরুলিয়ার ছোটো একটি আদিবাসী গ্রাম

Published

on

বরন্তি
Image credit : Wikipedia
Share This Article

বি জীবনানন্দ লিখেছিলেন “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর” । পাহাড়-পর্বত-সমুদ্র-জঙ্গলের আবরণে ভূষিত ভারতের পূর্বাংশের অন্যতম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। বাংলার শঙ্খচিল তাই কেবলমাত্র কবি বা সাহিত্যিকের লেখায় নয়, বিভিন্ন সিনেমার দৃশ্যেও দর্শকের মগজে এবং মননে নিজের রূপে স্বমহিমায় ধরা দিয়েছে। এই রূপের মোহেই পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে ভ্রমণ পিপাসু মানুষের আগমন ঘটেছে এ রাজ্যে। একাত্ম হয়েছেন স্থানীয় মানুষ, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সাথে। আপন করে নিয়েছেন এই স্থানের জল-বায়ু, খাদ্যরীতি এবং উৎসব আয়োজনকে। এ বাংলার বুকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর লাল মাটির দেশ পুরুলিয়া। পুরুলিয়া জেলাতে অবস্থিত বরন্তি।  ছবির মতো সুন্দর জায়গাটি আসলে একটি আদিবাসী গ্রাম। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও বরন্তির শান্ত সমাহিত ভাব এখনো বর্তমান।

আরো পড়ুন : মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ

পুরুলিয়ার ইতিহাসঃ-

পঞ্চ শতকের জৈন ভাগবতী-সূত্র অনুযায়ী পুরুলিয়া ১৬ তম মহাজনপদের মধ্যে অন্যতম ছিল এবং প্রাচীনকালে ভজ্রভূমি নামে এক দেশের অন্তর্গত ছিল। ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বাংলা, বিহার এবং উড়িশ্যার দেওয়ানী লাভের আগে পর্যন্ত পুরুলিয়া নিয়ে সেরকম কিছু জানা যায় না। ১৮০৫ সালে ১৮ তম অধিবেশনে পুরুলিয়া সহ  ২৩ পরগণা নিয়ে জঙ্গল মহল জেলা তৈরি হয়। ১৮৩৩ সালে ১৩ তম অধিবেশনে এই জেলা ভেঙ্গে মানভুম জেলা তৈরি হয়, জেলা সদর দপ্তর থাকে মানবাজারে।

জঙ্গল মহল অঞ্চলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব অধিক থাকার ফলে সমস্ত অঞ্চলটিকে অনেক গুলো ছোটো ছোটো জেলায় ভাগ করে যেমন- পাঞ্চেত [১৭৭৩], জঙ্গল মহল [১৮০৫], মানভূম [১৮৩৩] ।

তবে এই মানভূম জেলাটি আয়তনে অত্যন্ত বড়ো ছিল [প্রায় ৭৮৯৬ স্কোয়ার মাইল], বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ও বর্ধমান; ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ধানবাদ ও ধলভূম এবং উড়িষ্যার সারাইকেলা ও খারস্বান অঞ্চলগুলোও এই জেলার অন্তর্গত ছিল।

১৮৩৮ সালে জেলা সদর দপ্তর পুরুলিয়াতে স্থানান্তর করা হয়। এরপরেই জেলাটিকে নিয়মিত প্রশাসনের শাসন পদ্ধতিতে থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের গভর্নর জেনারেলের নিকটে প্রিন্সিপাল অ্যাসিস্টেন্স নামে এক আধিকারিকের অধীনে নিযুক্ত করা হয়। ১৮৫৪ সালে ২০ তম অধিবেশনে ‘প্রিন্সিপাল এজেন্ট’ কর্মকর্তা পদটি বদল করে ‘ডেপুটি কমিশনার’ নাম করে রাখা হয়।

মানভূম জেলাকে ১৮৪৫, ১৮৪৬, ১৮৭১ আর ১৮৭৯ সালে আবার বিভক্ত করা হয় যার ফলে এর আয়তন কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৪১১২ স্কোয়ার মাইল।

১৯০৫ সালে বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলন শুরু হয়। বাংলার বিভাজন থামে ১৯১১ সালে আর ১৯১২ সালে বিহার-উড়িষ্যার সৃষ্টি হয়। মানভূমকে বিহার-উড়িষ্যা ভুক্ত করা হলে মানভূমে বসবাসকারী বাঙলাভাষীদের মধ্যে নিজের মাতৃভাষা বাংলার ওপর হিন্দী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ করে।

অবশেষে ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুর্ন গঠন অধিনিয়ম এবং বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ [রাজ্য সীমানা হস্তান্তর] অধিনিয়ম ১৯৫৬, অনুযায়ী বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের মাঝে  মানভূম জেলাটি বিভক্ত হয়। ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বরে জন্ম হয় স্বতন্ত্র পুরুলিয়া জেলার।

আরো পড়ুন :ইকো পর্যটন উপভোগের ১০টি কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ প্রেমীদের জন্য!

পুরুলিয়ার ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যঃ-

পুরুলিয়ার ভৌগোলিক আয়তন হল ৬২৫৯ স্কোয়ার কিমি। পৌরসভা আর অপৌরসভা মিলিয়ে শহুরে অঞ্চলের আয়তন হল ৭৯.৩৭ স্কোয়ার কিমি [ মোট এলাকার ১.২৭%] এবং গ্রামীণ অঞ্চল হল ৬১৭৯.৬৩ স্কোয়ার কিমি অঞ্চল। পুরুলিয়া সদর পূর্ব, পুরুলিয়া সদর পশ্চিম এবং রঘুনাথপুর সহ তিনটি প্রাশাসনিক মহকুমা নিয়ে জেলা সদর দপ্তরটি পুরুলিয়াতে রয়েছে।

পুরুলিয়া রুক্ষ ঢেউ খেলানো ছোটো পাহাড় বিস্তৃত পশ্চিম এবং দক্ষিণ অংশে। পুর্বস্থ মালভূমি আর পাহাড়ের কৃষি জলবায়ু এবং ছোটোনাগপুর দক্ষিণ আর পশ্চিমবঙ্গ মালভূমি নিয়ে জেলাটি অবস্থিত। এটি ক্ষরা প্রবণ এলাকা সত্ত্বেও খানিক বৃস্টিপাত হয়ে থাকে। ১১০০-১৫০০ মিমি বৃস্টিপাত সারাবছর ধরে হয়ে থাকে। উচ্চ বাষ্পীভবন এবং নিম্ম বৃষ্টিপাতের কারণে এই জেলাতে একটি প্রায় গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় আবহাওয়া রয়েছে। বর্ষাকালে বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা অনেক বেশি থাকে, প্রায় ৭৫% থেকে ৮০%। গ্রীষ্মকালে এই পরিমাণ এসে দাঁড়ায় ২৫% থেকে ৩০%-এ। শীতকালে সর্ব নিম্ম তাপমাত্রা থাকে ৭ ডিগ্রী এবং গ্রীষ্মকালে থাকে প্রায় ৫০ ডিগ্রী। এই অঞ্চলে প্রায়ই  ভূমিক্ষয় হয়ে থাকে যার ফলে উপত্যকার দিকে প্রচুর পরিমাণে উর্বরা জমি তলিয়ে গেছে। অধিকাংশ অঞ্চল কৃষিকাজ করার অযোগ্য। সাঁওতাল, মুন্ডা, ভুমিজ, বিরহড়, খারিয়া, শবর জাতির আদিবাসিদের বসবাস এই জেলায়।

বরন্তিঃ-

পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরের কাছে বরন্তি হল একটি  ছোটো আদিবাসী গ্রাম। এই গ্রামকে ঘিরেই  গড়ে উঠেছ পুরুলিয়ার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। লাল মাটির রাস্তা, শাল-পিয়ালের জঙ্গল, শীতকালে ফুঁটে থাকা পলাশ ফুল- সব মিলিয়ে অপূর্ব সুন্দর এই উপজাতীয় গ্রাম। একদিকে রয়েছে বিহারিনাথ, অন্যদিকে গড়পঞ্চকোট পাহাড়। রয়েছে ছোটো পাহাড় ঘেরা সুবৃহৎ  বরন্তি লেক, গিয়ে মিশেছে দিগন্তের সাথে। বরন্তি লেকের পোশাকি নাম রামচন্দ্র পুর, একটি বিখ্যাত জলাধার। পর্যটন কেন্দ্র হলেও এখনো আধুনিকতার আঁচড় লাগে নি এই জায়গায়। মাটির বাড়ি, সাঁওতালি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং তাঁদের সরল জীবনযাত্রা বর্তমান।

বরন্তি থেকে কাছেই পাঞ্চেত পাহাড়। পাঞ্চেত পাহাড়ে পাদদেশে অবস্থিত গড়পঞ্চকোট, একটি ঐতিহাসিক স্থান। সুপ্রাচীন মন্দির, দুর্গ আরোও নানা রকমের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এই স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিখ্যাত পঞ্চ রত্ন মন্দিরটিকেও পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। বরন্তি থেকে গড়পঞ্চকোটের দূরত্ব মাত্র ১২ কিমি।

জয়চন্ডী পাহাড়ও একটি অসামান্য পর্যটন কেন্দ্র। পাহাড়ের চূড়োয় রয়েছে চন্ডী মন্দির। রয়েছে সিমাফোর টাওয়ার। টেলিগ্রাম জামানায় এই সিমাফোর টাওয়ারটি বিখ্যাত ছিল। বরন্তি থেকে জয়চন্ডী পাহাড়ের দূরত্ব ২১ কিমি।

শীতকালে বিদেশ থেকে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি এসে ভীড় করে বরন্তিতে। এই স্থানে শীতকাল হল পর্যটনের জন্য শ্রেষ্ঠ সময়। পাহাড় ঘেরা বরন্তি লেকের সামনে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য অসীম সুন্দর প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে।

কি করে যাবেন এবং থাকার জায়গাঃ-

কলকাতা থেকে বরন্তির দূরত্ব ২৩৫ কিমি। গাড়ি নিয়ে ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে প্রথমে আসানসোল থেকে মুরাডি হয়ে বরন্তি যাওয়া যায়।

বরন্তি গ্রামের সবথেকে কাছের রেল স্টেশন হল মুরাডি। মুরাডি থেকে গ্রামের দূরত্ব ৬ কিমি। বরন্তি যাওয়ার জন্য স্টেশনের সামনেই রিক্সা, ট্রেকার থাকে।

বরন্তিতে লেকের কাছেই বিভিন্ন আধুনিক সুব্যবস্থা সম্পন্ন রিসর্ট রয়েছে। অনলাইন বুকিং করার সুবিধে সহ কন্টিনেল্টাল, চাইনিজ, বাঙালী খাবার, স্টেশনে পিক আপ এবং ড্রপ করে দেওয়ার সুবিধে, তাঁবু পিচ করার জায়গা, বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুবিধে রয়েছে। কেউ চাইলে ট্রেকিং এবং রক ক্লাইম্বিং করার গাইডের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয় রিসর্ট থেকেই।

উপসংহারঃ

পুরুলিয়া নিঃসন্দেহেই অনিন্দ্য সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র। আদিবাসী গ্রাম, তাঁদের জীবনযাত্রা, শিল্প, ভাষা প্রভৃতি স্বতন্ত্র। ছৌ নাচ, টুসু পরব বিখ্যাত। রুক্ষ পরিবেশেও রাঢ় বাংলার লাল মাটির রাস্তা যেন আদরের প্রলেপ দিয়ে যায়। গভীর নীল রঙের জলে বরন্তি লেক পরমা সুন্দরী রাজকন্যে হলে শ্বাপদ সংকুল জঙ্গলে ঘেরা পাহাড় হল বরন্তি রাজকন্যের পাহারাদাড়। বরন্তি নদীতে বাঁধ দেওয়ার ফলেই এই লেকের সৃষ্টি। আবার দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলো পড়ে লেকের জলের রঙ এক এক রকম হয়ে থাকে। আদিবাসিদের অনাম্বড়হীন জীবনের ছাপ ধরা পড়ে গ্রামগুলোর বুকে হেঁটে এলেই। ভ্রমণ আমাদের শেখায় হৃদয় দ্বার উন্মুক্ত করতে। সামাজিক ভেদভাগ ভুলে পর্যটকেরা সকলের সাথেই আত্মীয়তার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। পর্যটন আমাদের শেখায়  মানবিকতার ধর্ম।

সমগ্র পুরুলিয়া জুড়ে দর্শনীয় স্থানের সংখ্যা রয়েছে প্রচুর। সরকার থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই সমস্ত স্থানের সঠিক রক্ষণাবেক্ষন করে বিশ্ববাসীর সামনে তা তুলে ধরা প্রয়োজন। গড়পঞ্চকোটের যে সমস্ত প্রত্নতাত্বিক ধংসাবশেষ রয়েছে তার দিকেও সরকারী তরফে নজর দেওয়া উচিত। আমাদের কাছে যে সম্পদ আছে খুব দেরি হওয়ার আগেই তার মর্ম আমাদের বুঝতে হবে।

Get more details: The West Bengal Tourism Development Corporation Limited (WBTDCL).

বি দ্রঃ বর্তমানে দেশের অনেক জায়গাতেই “কোভিড ১৯” এর জন্যে ভ্রমনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই ভ্রমণের আগে সরকারি নির্দেশ ও নিয়মাবলী মেনে চলাটাই বাঞ্চনীয় !

Continue Reading

Bengali Edition

বন্যপ্রানী অভয়ারণ্য : বাংলাদেশের দশটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

Published

on

বন্যপ্রানী অভয়ারণ্য
Image credit : Wikipedia
Share This Article

বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বা Wildlife Sanctuary এক কথায় বনের প্রাণীগুলোর জন্য নিরাপত্তার অপর নাম। নির্দিষ্ট আয়তন জুড়ে যে এলাকায় বন্যপ্রাণীদের নিরাপত্তা, খাদ্যসংস্থান ও প্রজননের জন্য তাদেরকে অবাধ বিচরণের সুযোগ দেওয়া হয় সেটাই ‘বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য’ হিসেবে পরিচিত। দিনে দিনে মানুষ যতো আধুনিক সভ্যতার দিকে এগোচ্ছে ততোই মানুষ প্রকৃতির জন্য হুমকি স্বরূপ বিরাজ করছে, প্রাণী হত্যা থেকে প্রাণী পাচার কোনো জায়গাতেই এখন পিছিয়ে নেই তারা। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে একটা সময় পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুল বিলীন হয়ে যাবে, এতে করে বাস্তুতন্ত্রের যে ভারসাম্য বর্তমানে আছে সেটা আর থাকবে না এবং মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই প্রাণীরক্ষার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে অভয়ারণ্য দূর্দান্ত! 

আসুন জেনে নিই বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ১০টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সম্পর্কে- 

১০. চর কুকড়ি-মুকড়ি 

প্রায় ৪০ হেক্টর আয়তনের এই অভয়ারণ্যটি বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোটো বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। বরিশাল বিভাগের অন্তর্গত ভোলা জেলার একেবারে দক্ষিণ দিকে চরটির অবস্থান, স্থানীয়ভাবে চরটির নাম ‘কুকড়ি-মুকড়ি’। চরটির আরেক নাম “দ্বীপকন্যা”। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় কয়েকশো’ বছর আগে চরটি জেগে ওঠে, ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ একে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। চরটিকে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি হরিণ, লাল কাঁকড়া, বুনো মহিষ, বানর, বনবিড়াল, উদবিড়াল, শেয়াল, বনমোরগসহ আরো নানাপ্রজাতির অতিথি পাখি ও বন্যপ্রাণী রয়েছে। মনজুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য ও পরিবহন ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় এটি অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও দিনে দিনে জনপ্রিয় হচ্ছে।  

৯. চুনতি অভয়ারণ্য 

বাংলাদেশের অন্যতম বড়ো শহর চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে চুনতি অভয়ারণ্য অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় ৭ হাজার ৭৬৪ হেক্টর। প্রচুর টিলা, গভীর ও অগভীর খাদ এবং পাহাড়ী ভূপ্রকৃতি মিলিয়ে এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটির ভূমি যথেষ্ট বৈচিত্র্যময় বটে। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে এশীয় হাতির চলাচল অবাধ করতে এই অভয়ারণ্য করিডোরের মতো কাজ করে। এই বনে প্রায় ১২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ দেখা যায় যার মধ্যে ৪৫ প্রজাতি উঁচু উদ্ভিদের। গর্জন, রাকতান, জাম, উরি আম, চাপালিশ, শিমুল, কড়ই ছাড়াও প্রচুর ভেষজ উদ্ভিদ এই বনের অন্যতম আকর্ষণ। পূর্বে এই অভয়ারণ্যে প্রায় ১৭৮ প্রজাতির জীবজন্তু ও পাখি পাওয়া যেতো যার মধ্যে উভচর, স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, পাখি সবই ছিলো। বর্তমানে দূষণসহ অন্যান্য কারণে এর জীববৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। 


আরো পড়ুন : সীতাকুন্ড :এশিয়ার বৃহত্তম বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক !

৮. দুধ্মুখী অভয়ারণ্য 

বাংলাদেশের দক্ষিণে খুলনা বিভাগের অন্তর্গত বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত অন্যতম দর্শনীয় স্থান দুধমুখী অভয়ারণ্য, এটি মূলত একটি বিস্তৃত জলাভূমি। ২০১২ সালে এলাকাটি অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত হয়। প্রায় ১৭০ হেক্টরের মতো জায়গা নিয়ে অভয়ারণ্যটি অবস্থিত। শকুনের নিরাপদ এলাকা-২ তফসিল অনুসারে এটি শকুনের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে স্বীকৃত। 

 ৭. হাজারিখিল অভয়ারণ্য  

চট্টগ্রাম শহর থেকে উত্তরে রামগড়-সীতাকুন্ড বনাঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত বিস্তীর্ণ হাজারিখিল অভয়ারণ্য। প্রায় ১১৮ হেক্টর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি হাজারো জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। এ অভয়ারণ্যে প্রায় ১২৩ প্রজাতির পাখি, মথুরা, কাঠময়ূর, কাউ ধনেশ ও হুতুম পেঁচা আছে। পাখির বিশাল সংগ্রহের জন্য একে মাঝারি আকারের একটি ‘পক্ষীরাজ্য’ বল্লেও বোধহয় বোধহয় ভুল হবে না। বিশাল বনভূমি ও অনুকূল পরিবেশ থাকায় এই বনে এমন কিছু পাখি পাওয়া যায় যেগুলো কিনা সচরাচর আমরা অন্যান্য কোনো বনাঞ্চলে দেখতে পাই না; এর মধ্যে আছে হুদহুদ, চোখ গেল, নীলকান্ত, বেঘবৌ, আবাবিল। এছাড়াও পরিযায়ী পাখির জন্য এই অভয়ারণ্য একটি সত্যিকার ‘অভয়’! ২০১০ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। 

৬. টেকনাফ গেম রিজার্ভ 

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন একটি অভয়ারণ্য এই টেকনাফ গেম রিজার্ভ, ১৯৮৩ সাল থেকে বন্য হাতির অভয়ারণ্য হিসেবে এটি প্রসিদ্ধ। বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় টেকনাফ উপদ্বীপে এর অবস্থান। প্রায় ১১ হাজার ৬১৫ হেক্টর জায়গাজুড়ে এটি বিস্তৃত। 

বাংলাদেশের মধ্যে সর্বাধিক জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অভয়ারণ্য হিসেবে ধরা হয় টেকনাফ গেম রিজার্ভকে। এই বনে প্রায় ২৯০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৫৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৮৬ প্রজাতির উদ্ভিদ, উভচর ও সরীসৃপ। বাংলাদেশে বসবাস করা বুনো হাতির প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ টেকনাফের এই অভয়ারণ্যে বাস করে। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ কুদুম গুহা বা বাদুড় গুহা। 

৫. সাঙ্গু অভয়ারণ্য 

বান্দরবান জেলার পার্বত্য এলাকাজুড়ে অবস্থিত সাঙ্গু-মাতামুহুরী বনাঞ্চল, এর মধ্যে দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্রোতধারা বয়ে চলেছে সাঙ্গু নদী। লামা উপজেলার ২৩৩১ হেক্টর জমির উপর এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি অবস্থিত। এই অঞ্চলে হাতি, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ভাল্লুকসহ নানা বিরল প্রাণীর বিচরণ দেখা যায়। ২০১০ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ একে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে, এর সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন করে থাকে বন বিভাগের অধীনস্থ লামা বন বিভাগ। শুধুমাত্র বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবেই নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছেও এর যথেষ্ট কদর রয়েছে। 

৪. ফাঁসিয়াখালী অভয়ারণ্য 

২০০৭ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটিকে স্বীকৃতি দেয়। প্রায় ১ হাজার ৩০২ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই অভয়ারণ্যে স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ইকোপার্ক, যা কিনা পরিবেশপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অন্যতম একটি অ্যাডভেঞ্চারের জায়গা। বন প্রকৃতি অনুযায়ী এটি ক্রান্তীয় চিরহরিৎ বন, গর্জন গাছের বুবিশাল ছায়ায় চলতে চলতে দেখা মিলবে বুনো শুয়োর, চিতাবাঘ, শুয়োর ও বুনো হাতির। এছাড়াও এর ঘন বনের মধ্যে দেখা মিলবে বিরল প্রজাতির শুশুক, উলটো লেজ বানরের। 

৩. সোনারচর অভয়ারণ্য 

পটুয়াখালী জেলার রাঙাবালী উপজেলার অন্তর্গত সোনারচর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য দেশীয় পর্যটকের কাছে অন্যতম দর্শনীয় একটি স্থান। প্রায় ২ হাজার ২৬ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই অভয়ারণ্যে একইসাথে সমুদ্রসৈকত ও বনাঞ্চলের হাতছানি পাওয়া যাবে। শকুনের নিরাপদ এলাকা-১ তফসিল অনুযায়ী এটি শকুনের জন্য অভয়ারণ্য হিসেবে বিবেচিত। 

সমুদ্র সৈকতের পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত এখানকার একটি অন্যতম আকর্ষণ, সাথে আছে অজস্র লাল কাঁকড়ার গালিচা! সূর্যের প্রখর রোদ যখন তীরের বালির উপর পড়ে তখন তীরের বালি চমকে একটি সোনালী আভার সৃষ্টি করে, যার কারণে দূর থেকে দেখে মনে হয় এখানে সোনার প্রলেপ দেওয়া। এ কারণেই স্থানীয়রা এই জায়গার নাম দিয়েছে সোনারচর! 

২. রেমা কেলেঙ্গা অভয়ারণ্য 

সুন্দরবনের পর বাংলাদেশের সবচাইতে বড়ো প্রাকৃতিক বনভূমি হচ্ছে রেমা কেলেঙ্গা বনভূমি। সিলেটের হবিগঞ্জে অবস্থিত এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে ভরপুর সমৃদ্ধ ও বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জায়গাব্যাপী বিস্তৃত এই বনভূমি একটি শুকনো ও চিরহরিৎ বন, বাংলাদেশ বন বিভাগ ১৯৮২ সালে এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়। 

১৬৭ প্রজাতির একটি বড়ো পক্ষীবাহিনীর বিচরণ এই রেমা কেলেঙ্গা অভয়ারণ্যে, যার মধ্যে ভীমরাজ, টিয়া, লালমাথা কুচকুচি, বসন্তবৌরি, মাছরাঙ্গা, সিপাহি বুলবুল অন্যতম। এছাড়াও আছে প্রায় ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্ম। 

১. সুন্দরবন 

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ধরা হয় সুন্দরবনের দক্ষিণ অংশকে। সুন্দরবনের প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জায়গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃত, ব্যাপক প্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সুন্দরবনকে বাকি সবগুলো অভয়ারণ্য থেকে মৌলিক একটি পরিচয় দিয়েছে। এ বনে প্রায় ৫০০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে যা কিনা সারাবিশ্বের মধ্যে এখানেই পাওয়া যায়। এছাড়াও আছে ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি। বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ সরীসৃপ, ৩৭ শতাংশ পাখি ও ৩৭ শতাংশ স্তন্যপায়ী এই সুন্দরবনেই বসবাস করে। বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি। 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হওয়ার সাথে সাথে বনাঞ্চলগুলো ব্যাপকভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণী বৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে পরম মমতায়, যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যগুলো। পর্যটক ও অধিবাসী সকলেরই উচিৎ এই এলাকাগুলোকে যথাযোগ্য মর্যাদায় সংরক্ষণ করা। কারণ ঝড়-তুফানে এই এলাকাগুলো যেভাবে ঢাল হয়ে দেশকে রক্ষা করে তেমনিভাবে বস্তুতন্ত্রকে আগলে রাখে পরম মমতায়! আজন্ম ঋণ তাই প্রকৃতির কাছে মানবজাতির! 

বি দ্রঃ বর্তমানে দেশের অনেক জায়গাতেই “কোভিড ১৯” এর জন্যে ভ্রমনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই ভ্রমণের আগে সরকারি নির্দেশ ও নিয়মাবলী মেনে চলাটাই বাঞ্চনীয় !

Continue Reading

Bengali Edition

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদঃ- একটি ঐতিহাসিক ইকো পর্যটন কেন্দ্র

Published

on

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ
Share This Article

দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ অবসর যাপনের জন্য সর্বদা বেঁছে নিয়েছে পর্যটনকে। বিভিন্ন  ছুটিতেই পর্যটন  হোক বা ছাত্রাবস্থার শিক্ষামূলক ভ্রমণ, সকলেই বিপুলা এই দেশের নদ-নদী, অরণ্য- পর্বত, সাগর-মরুভূমি, ঐতিহাসিক স্থানের তাৎপর্য এবং প্রয়োজনীতা মেনে নিয়েছে। অতীত অগ্রাহ্য করে কখনোই বর্তমানকে জানা যায় না। তাই আমাদের সকলেরই  ঐতিহাসিক স্থানগুলো ভ্রমনের আবশ্যকতা আছে। দেশ আর দশের কথা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি জানতে ভ্রমন প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে মুর্শিদাবাদ অন্যতম। হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া, মতিঝিল, হিরাঝিল প্রভৃতি নানা দ্রষ্টব্য স্থান রয়েছে। মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ জেলার ঐতিহাসিক স্থানের সাথে সাথে একটি ইকো পর্যটন কেন্দ্রও।

মুর্শিদাবাদের ইতিবৃত্তঃ-

পুর্বে এই শহরের নাম ছিল মুখসুদাবাদ। নবাব ঔরঙ্গজেব তৎকালীন বাংলা প্রদেশের জন্য একজন সুচারু দক্ষ আর সৎ দেওয়ান খুঁজছিলেন, সেই সময়েই তাঁর নজরে আসেন মির্জা হাদি, আর কিছু বছর পরেই সমস্ত দেশ যাকে চিনবে মুর্শিদ কুলি খাঁ নামে। ১৭০০ দিল্লি থেকে মির্জা হাদি তৎকালীন বাংলা প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় আসেন বাংলার দেওয়ান এবং মুখসুদাবাদের ফৌজদার হিসাবে।

মির্জা হাদির জীবন সম্পর্কে বহুল কথা প্রচলিত আছে। কোথাও বলা আছে মুঘল শাসনকালের এক উচ্চপদস্থ প্রাক্তন কর্তা ইস্ফানের হাজি শাফি তাঁকে ইরান দেশে নিয়ে যান এবং অভিভাবক হিসেবে জত্ন-লালন করার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় শিক্ষাদান করেন। এরপর  হাজি শাফির মৃত্যুর পর মির্জা হাদি ভারতে ফিরে এসে মুঘল সরকারের অধীনে কাজ শুরু করেন। নিজের দক্ষতার জন্যই তিনি নবাবের সুনজরে পড়েন  ১৭০০ সালে নবাব ঔরঙ্গজেব তাঁকে কার্তালাব খাঁ উপাধি দান করেন। তবে নবাবের বিশ্বস্ত এবং কাছের মানুষ হয়ে ওঠার ফলে নবাব পৌত্র আজিম-উশ-শানের হিংসের শিকার হন মির্জা হাদি। এমনকি তাঁর প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দেয়। তার ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ১৭০৪ সালে ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে আনা হয় মুখসুদাবাদের গঙ্গা নদীর তীরে। তাঁর সততা আর পরিশ্রম দেখে ঔরঙ্গজেব তাঁকে মুর্শিদ কুলি খাঁ উপাধি দেন এবং বাংলা, বিহার আর উড়িষ্যার ডেপুটি হিসেবে নিযুক্ত করেন। এরপরেই মির্জা হাদি নিজের উপাধি স্বরূপ মুখসুদাবাদের নাম বদলে মুর্শিদাবাদ রাখেন। ১৭১৩ সালে বাংলা প্রদেশের নায়েব নাজিম হিসেবে তাঁকে নিযুক্ত করা হয় এবং ১৭১৭ তিনি বাংলা বিহার আর উড়িষ্যার সুবেদার হন। এই ভাবেই বাংলায় নবাবি শাসনের গোড়াপত্তন ঘটে এবং জন্ম নেয় মুর্শিদাবাদ। উল্লেখ্য ১৭৫৬ সালে আলিবুর্দি খাঁর দৌহিত্র  সিরাজ-উদ-দৌল্লা নবাব হন। তিনিই ছিলেন  বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।

এই আমলেই গড়ে ওঠে একের পর এক সুদৃশ্য প্রাসাদ, উদ্যান, মসজিদ, মন্দির, সমাধি স্থল। গজিয়ে ওঠে নানা লৌকিক-অলৌকিক গল্প-কথা, ভাগীরথির তীর ধরে হেঁটে গেলে যা আজোও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়।

মুর্শিদাবাদের জনপ্রিয় স্থানগুলো হল- হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া ও মদিনা, কাটরা মসজিদ, মতিঝিল পার্ক, জগত শেঠের বাড়ি, তোপখানা, খোসবাগ, বড়নগর রাণী ভবানীর মন্দির, রাধামাধব মন্দির, চক মসজিদ, নশীপুরের রাজবাড়ী, রোশনি বাগ, হীরাঝিল, আজিমুন্নেসা বেগমের সমাধি, জাফরাগঞ্জ সমাধি ক্ষেত্র প্রভৃতি।

 মতিঝিলের ইতিবৃত্তঃ-

মতিঝিল কথার অর্থ হল মুক্তোর ঝিল। আলিবুর্দি খাঁর জামাতা নৌজেশ আহমেদ খাঁ তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ আলিবুর্দি খাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগমের জন্য একটি অপূর্ব সুন্দর প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এই প্রাসাদের নাম ছিল সাংহী দালান, বর্তমানে একে কোম্পানী বাগ বলা হয়ে থাকে। এই প্রাসাদের তিনদিক ঘিরে ৩৫০ একরের একটি অশ্বক্ষুরাকৃতি জলাধার এবং আরেকদিক ছিল নগর সংলগ্ন। এই ঝিলটি বিখ্যাত ছিল Unino Margaritifera প্রজাতির সোনালি সাদা মুক্তোর চাষের  জন্য।  নৌজেশ আহমেদ খাঁ এবং ঘসেটি বেগম এই প্রাসাদেই বাস করতেন। তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন। এক্রামউদ্দৌলাকে দত্তক নিলেও কিছু বছর পরেই তাঁর মৃত্য ঘটে। পুত্রশোকাতুর নৌজেশ ১৭৫৫ সালেই মারা যান এবং এই মতিঝিলের সমাধি ক্ষেত্র কালা মসজিদে দত্তক পুত্রের পাশেই তাঁকে কবরস্থ করা হয়।

সাংহী দালান গড়ে তোলা হয়েছিল গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে সংগ্রহ করা কালো মার্বেল পাথর ব্যবহার করে। ১৭৫৭-১৭৮৬ সালে মতিঝিল ছিল বিভিন্ন লর্ড ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্টিংস সহ প্রমুখ  ইংরেজ কর্তাব্যাক্তিদের আস্তানা।

আমিনা বেগম এবং জৈন উদ-দ্দিন আহমেদ খাঁয়ের পুত্র তথা আলিবুর্দি খাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজ উদ-দৌল্লা এরপর সিংহাসনের অধিকার দেন। এই সিদ্ধান্তে যারপরনাই ক্ষুদ্ধ ঘসেটি বেগম নবাব-বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হন এই প্রাসাদ প্রাঙ্গনে বসেই।বলা যায় এই মতিঝিল চত্বরটিই হয়ে ওঠে সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মন্ত্রনালয়।  যুবক নবাব সিরাজকে উৎখাত করতে মীর জাফর, জগত শেঠ এবং ব্রিটিশদের মধ্যে ঘসেটি বেগম যোগসাজশ করেন নিজের প্রভূত সম্পদ এবং ক্ষমতার জেরে। ২৩ শে জুন ১৭৫৭ সালে মতিঝিল থেকেই পলাশির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌল্লা। মীর জাফরের নেতৃত্বাধীন নবাবের অধিকাংশ সৈন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ফলে অনিবার্য ভাবেই পতন হয় সিরাজের শাসনকালের।

মতিঝিলের সৌন্দর্য দেখেই ঈর্ষান্বিত সিরাজ তৈরি করেন হিরাঝিল। তবে এই কথা একবাক্যে স্বীকার করা যায় যে ভারতের শাসন ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পালাবদলের সাক্ষী এই মতিঝিল। এই প্রাঙ্গনকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ।

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদঃ-

ঘসেটি বেগমের মতিঝিল প্রাসাদ যদিও কালের প্রকোপে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে, কিন্তু সেই প্রাসাদকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বর্তমানে মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকে এটি কোম্পানি বাগ নামে পরিচিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন বিভাগের তত্ত্বাবধানে এই পার্কটি সুসজ্জিত হয়ে উঠেছে গোলাপ বাগান, পাতাবাহারি গাছ, মরশুমি ফুল, সবুজ ঘাসের নরম গালিচা এবং আরোও বিভিন্ন রকম গাছের সমারোহে। এছাড়াও সেখানে রয়েছে নবাবদের ও তাঁদের বংশের নানা মূর্তি, মিউজিক্যাল ফোয়ারা। রয়েছে আলো এবং শব্দের মাধ্যমে মুর্শিদাবাদের নানারকম ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা বিশেষ করে নবাব সিরাজ উদ-দৌল্লার পতনের ইতিবৃত্ত এখানে সুন্দর করে বর্ণনা করা হয়। সুদৃশ্য পাথর বিছানো রাস্তা চলে গেছে একেবেকে মতিঝিল পার্কের মধ্যে দিয়েই।

বাচ্চাদের জন্য রয়েছে দোলনা, সি-স, স্লিপার, টয়-ট্রেন, ড্রাগন ট্রেন সহ আরোও নানা রকম অ্যাডভেঞ্চার রাইড। পার্কের ভেতরে রয়েছে বেশ কিছু বিশ্রাম স্থল, পক্ষী আলোয়, ছবি তোলার জন্য সুদৃশ্য জায়গাও। সাইকেল, বিদ্যুৎ চালিত পরিবেশ বান্ধব গাড়ি রয়েছে, পর্যটকরা যা ভাড়া নিয়ে মতিঝিল পার্কের ভেতরে ঘুরতে পারেন। শীতকালে এই পার্কের লেকে পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে যায়। পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে সুদৃশ্য হোটেল ব্যবস্থা। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন বিভাগের নিজস্ব রিসর্ট আর হলিডে হোম এই পার্ক এর মধ্যেই অবস্থিত যা সুসজ্জিত বাগান এবং ফোয়ারা দ্বারা পরিবেষ্টিত। এছাড়া রয়েছে সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট মঞ্চ যার সংলগ্ম জমিতে ১০০ জন পর্যন্ত অতিথির স্থান সংকুলান সম্ভব। আরো ব্যবস্থার মধ্যে ১০০জনেরও বেশি পিকনিক করার স্থান, যে কোনো রকম গাড়ি স্বল্প অর্থের বিনিময়ে রাখার জায়গাও রয়েছে পার্কের মধ্যেই। পর্যটকদের জন্য মালপত্র রাখার জায়গাও আছে যেখানে প্রথম আগমনের সময়  অনুসারে স্বল্প মূল্যে ৬ ঘন্টা অবধি যেকোনো মালপত্র রাখা যায়।

কি করে যাবেনঃ-

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ থেকে মুর্শিদাবাদ রেল স্টেশনের দূরত্ব ২ কিমি এবং লালবাঘ কোর্ট রোড রেল স্টেশনের দূরত্ব ৩ কিমি। শিয়ালদহ বা কোলকাতা জংশন স্টেশন থেকে শিয়ালদহ-লালগোলা বিভাগের যে কোনো ট্রেন এ করে এই স্টেশন গুলিতে পৌছনো সম্ভব। শিয়ালদহ বা কোলকাতা জংশন স্টেশন থেকে দূরত্ব ১৯৭ কিমি।

নেতাজী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর মুর্শিদাবাদের সব থেকে নিকটতম বিমান বন্দর যার দূরত্ব পার্ক থেকে ২১০ কিমি।

এছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে বাস যাতায়াত করে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে। বাসে করে চার্চ মোড়ে, যার দূরত্ব পার্ক থেকে ১০কিমি অথবা বহরমপুরের পঞ্চাননতলা মোড়ে, যার দূরত্ব পার্ক থেকে ১৪কিমি নেমে বাকি পথ রিক্সা বা টাঙ্গা গাড়ি বা ট্যাক্সি করে যেতে হবে।

আরো পড়ুন : ইকো পর্যটন উপভোগের ১০টি কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ প্রেমীদের জন্য।

উপসংহারঃ-

এই মুর্শিদাবাদেই অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীন নবা্বী শাসনের সূর্য। শুরু হয় বাংলার বুকে ব্রিটিশরাজ। এই বাংলা থেকেই আবার জন্ম নিয়েছে একের পর এক বিপ্লবী। তাঁদের গৌরব গাঁথা অমলিন। রাজ্যের একাধিক স্থানে এরকমই অনেক ঐতিহাসিক সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে। বেশ কিছু নষ্ট হয়ে গেছে পরিচর্যার অভাবে। নাগরিক এবং সরকার দু’ তরফেরই উচিত এই সম্পদের প্রতি যত্নশীল হওয়া। ইকো পর্যটন করতে গিয়ে ঘোরার জায়গা এবং তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে দায়বদ্ধতা খুব দরকারী। যেখানে মর্জি নোংরা করা, থুতু ফেলা, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল ফেলার মতো কু-স্বভাব থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে।  পরিবেশ রক্ষা করার দায় আজ সমাজের প্রতিটি মানুষের। আজকে আমাদের পদক্ষেপের ফলেই এই বসুন্ধরা বাসযোগ্য হয়ে উঠবে আগামী প্রজন্মের জন্য

বি দ্রঃ বর্তমানে দেশের অনেক জায়গাতেই “কোভিড ১৯” এর জন্যে ভ্রমনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই ভ্রমণের আগে সরকারি নির্দেশ ও নিয়মাবলী মেনে চলাটাই বাঞ্চনীয় !

Continue Reading

Trending