অরণ্য সপ্তাহ পালন এবং তার প্রয়োজনীয়তা - We Talk about Nature spankbang xxnx porncuze porn800.me
Connect with us

Bengali Edition

অরণ্য সপ্তাহ পালন এবং তার প্রয়োজনীয়তা

Published

on

অরণ্য সপ্তাহ
Image credit Pixabay (Prettysleepy)
Share This Article

ভ্যতা সৃষ্টির আদিযুগ থেকেই অরণ্য আমাদের আগলে রেখেছে শিশুর মত। দিয়েছে আমাদের প্রয়োজনীয় উপাদান- পোশাক, ঔষধি এবং খাদ্য। মানব সমাজ এবং জীবনযাত্রার সাথে আরণ্যক জীবন ও সেখানে বসবাসকারী জন্তু-জীবদের মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকলেও এদের একে অপরের সাথে যোগসূত্রও অপরিসীম। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতে অসমর্থ হলে মানব জীবনও অচিরেই ধ্বংসের মুখোমুখি হবে। মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপের ফলে আজ বিশ্বের একের পর এক বনের এবং বনবাসী জীবদের জীবন ক্ষতিগ্রস্থ। বিলুপ্ত হয়ে পড়ছে নানাবিধ উদ্ভিদ, জন্তু, পাখি। অথচ আদিম যুগে এই পরিবেশকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল জীবনের ও জ্ঞানের জয়যাত্রা। বিভিন্ন দেবদেবীর আড়ালে পূজিতও করা হতো প্রকৃতিকে। কিন্তু নাগরিক সভ্যতার আগ্রাসনে ক্রমাগত সংকুচিত হয়েছে শ্যামলছায়া বীথিতল। তাই অনেকটা দেরি করে হলেও পরিবেশ রক্ষার্থে এবং আগামী প্রজন্মকে পরিবেশ নিয়ে সচেতন করতে বিগত কয়েক বছর ধরেই ১৪ই জুলাই থেকে ২০শে জুলাই পালন করা হয়ে থাকে অরণ্য সপ্তাহ।

ভারতে অরণ্যের বর্তমান পরিস্থিতিঃ-

২০১৭ সালের ১৫তম রাজ্য বন জরিপ সমাবেশে দেখা গেছে যে এই দেশের পূর্বে বিবেচিত ৫৮৯টি জেলার বদলে ৬৩৩টি জেলাকে সবুজ আচ্ছাদনে ছাওয়া দেখাচ্ছে। পরিবেশ মন্ত্রক অনুযায়ী এই দেশের বনাঞ্চল বৃদ্ধি পেয়েছে যেখানে বিশ্বে বনের পরিমাণ ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। এই রিপোর্টে আরও জানা যায় যে ভারতের মোট ভূখণ্ডের ২৪.৪% জুড়ে যে বন রয়েছে তা ১৭% মানুষ এবং ১৮% গবাদি পশুর জীবন নির্ধারণে সাহায্য করে। ISFR (Indian State Forest Report) অনুযায়ী পশু সম্পত্তি, জনসংখ্যা বৃদ্ধির এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের ৬৩০ স্কোয়ার কিমি সবুজ হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ৮,০২১ স্কোয়ার কিমি বনাঞ্চল এবং গাছের সবুজ আচ্ছাদনের পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে। যা মোট বৃদ্ধির ১%।

 ২০১৮ সালে Ministry of Environment, Forest and Climate Change অনুযায়ী দেশের মোট ৮,০২,০০৮ স্কোয়ার কিমি স্থান শ্যামল আচ্ছাদিত হয়েছে যা ভারতের মোট ভৌগোলিক আয়তনের ২৪.৩৯%।

২০১৫ সালের আগে বনাঞ্চলের পরিমাণ ছিল ৭,০৮,২৭৩ স্কোয়ার কিমি যা মোট ভৌগোলিক আয়তনের ২১.৫৪% ছিল। ২০১৫-২০১৭ সালে ভারতের তরফে আরও ৬,৭৭৮ স্কোয়ার কিমি বনাঞ্চল এবং ১,২৪৩ স্কোয়ার কিমি অঞ্চল জুড়ে গাছের পরিমাণ বৃদ্ধি দেখানো হয়েছে।

২০১৯ সালের ৩০শে ডিসেম্বর ভারতের ৮,০৭,২৭৬ স্কোয়ার কিমি এলাকা জুড়ে দেখা গেছে সবুজের আচ্ছাদন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। যা এই দেশের মোট ভৌগোলিক আয়তনের ২৪.৫৬%। ভারতের লক্ষ্য আগামী দিনে এই মোট ভূখণ্ডের ৩৩% বনাঞ্চল ভুক্ত করা।

এই বছরের তথ্যনুসারে ২০০৯ সালের থেকে দেশের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে ৩,১৯৯ স্কোয়ার কিমি বন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এই অঞ্চলের ১,৭০, ৫৪১ স্কোয়ার কিমি স্থানে সবুজের দেখা মেলে যা এই অঞ্চলের ৬৫.০৫%, পূর্বে পরিমাণ ছিল ৭০-৮০%। কিন্তু মূলত স্থানান্তর করতে থাকা কৃষি কাজের ফলে এই স্থানের বনাঞ্চল হ্রাস পেয়েছে।

তবে এখানে একটু নজর দেওয়া দরকার, আমরা “ফরেস্ট কাকে বলব” এবং তা নির্ণয় করার বিভিন্ন প্যারামিটারগুলো। বনাঞ্চল পরিমাণ পদ্ধতি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বন এবং উদ্ভিদ আচ্ছাদিত অঞ্চলকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

ক) গভীর ঘন জঙ্গল – ৭০% অধিক বৃক্ষের আবরণ থাকবে,

খ) মাঝারি ঘন জঙ্গল- ৪০-৭০% বৃক্ষের আবরণ থাকবে,

গ) মুক্ত অরণ্য- ১০% বৃক্ষ আবরণ থাকবে যে সমস্ত জমিতে।

২০১৭ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে যে কেন্দ্রীয় সরকার ১০% বৃক্ষ আচ্ছাদিত অঞ্চলকেই গভীর ঘন জঙ্গল রূপে চিহ্নিত করেছে। কৃত্রিম উপগ্রহ দ্বারা চাষ-আবাদের জমি, ঝোপঝাড়, রবার চাষ, চা বাগান, ফলের বাগান সমস্তই এই বনাঞ্চলের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। একটি চা বাগানের প্রতি হেক্টর জমিতে আচ্ছাদন ঘনত্বের পরিমাপ করলে তা ৪০% অর্থাত মাঝারি বনাঞ্চল হিসেবে দাঁড়ায়।

এমনকি গোয়া রাজ্যতে ২০১৭ সালে নারকেল গাছকে তৃণজাতীয় উদ্ভিদের তকমা দেওয়া হয় কারণ Goa, Daman and Diu (Preservation) of Tress Act, 1984 এর আওতায় এই সমস্ত অঞ্চলের নারকেল গাছ কাটার ব্যাপারে নির্দিষ্ট বিধি নিষেধ আছে। কিন্তু তৃণ শ্রেণীভুক্ত দেখালে নিয়মের বেড়াজাল অনেকাংশেই শিথিল হবে এবং তার সাথেই সমুদ্র সন্নিকটে রিসোর্ট, হোটেল ব্যবসার রমরমা পসার হবে।

এর সাথেই আম্ফান কবলিত সুন্দরবন এলাকার নিরীক্ষণ করতে গিয়ে দেখা গিয়েছে গত তিন দশক ধরেই ভুমিক্ষয়ের ফলে একটু একটু করে পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ২৪.৫৫% অবলুপ্ত হয়েছে। যা প্রায় ১৩৬.৭৭ স্কোয়ার কিমি। ২০১৯ সালে এই রাজ্যে ম্যানগ্রোভ অরণ্য ছিল ৪২.৪৫%। একের পর এক সাইক্লন, যথেচ্ছাচারে অরণ্যচ্ছেদন, প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়েই বেআইনি ভেড়ি স্থাপনের ফলে এই গাছের হার ক্রমেই কমছে।

অরণ্যের প্রয়োজনীয়তাঃ-

সভ্যতার শুভ সুচানা হয়েছিল অরণ্যকে কেন্দ্র করেই। জ্বালানি, ফল, ভেষজ ওষুধ, পুঁথি লেখার গাছের ছাল, সাজ সরঞ্জাম,পরনের পোশাক, শিকারের পশু প্রায় সমস্ত কিছুর জন্যেই মানব নির্ভর করে থাকতো গাছ এবং অরণ্যের ওপরেই। এই সময়ের বুকে দাঁড়িয়েও মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে উদ্ভিদ এবং বনের ওপর নির্ভরশীল –

ক) আদিবাসী সম্প্রদায়ের বেশ কিছু সংখ্যক এখনো অরণ্য নিবাসী। উদ্ভিদ থেকেই আরোহণ করে জ্বালানির শুখনো কাঠ, পশু, কুটির তৈরীর সরঞ্জাম।

খ) অরণ্য থেকেই সংগৃহীত এমন কিছু ভেষজ উপাদান যার চিকিৎসা ক্ষেত্রে মূল্য অপরিসীম।

গ) অরণ্যয়েই মৌমাছি সংরক্ষণ এবং পালন, রেশমের জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে।

ঘ) কাগজ, প্লাইউড, রেয়নের মতো একাধিক জিনিষের কাঁচামাল আসে অরণ্য থেকেই।

ঙ) অরণ্যের বুকেই আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন প্রাণীকুল, কীট-পতঙ্গ, পক্ষীকুল। যার ফলে সুরক্ষিত রয়েছে বায়োডাইভার্সিটি আর বাস্তুতন্ত্র।

চ) পরিবেশ দূষণ রোধে এবং বাতাসে অক্সিজেনের ভারসাম্য রক্ষার্থেও অরণ্যের ভুমিকা অপরিসীম।

অরণ্য সপ্তাহ পালনঃ-

National Forest Policy 1988 এর বন সংরক্ষনের নীতির কথা মাথায় রেখে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অরণ্য সপ্তাহ এবং বন্য প্রাণ সপ্তাহের সূচনা হয় ২০০৬-২০০৭ সালে। ১৪ই জুলাই থেকে ২০শে জুলাই অব্দি ৭ দিন ব্যাপী চলা এই অনুষ্ঠানে রাজ্যের বিভিন্ন জেলাগুলোয় বনদপ্তর থেকে কয়েক হাজার চারা গাছ বিলি করা হয়। ২০১৬ সালের অরণ্য পালন এবং বন মহোৎসবে রাজ্যের পুরুলিয়া শহর জুড়ে প্রায় ২০ লাখ চারা গাছ বিলি করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন স্কুলগুলোতেও পালন করা হয়ে থাকে এই অনুষ্ঠান। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পদযাত্রা, সচেতনতা মূলক ক্যাম্প, গাছের চারা বিলি এবং তা রোপণ করানোর মতো একাধিক কার্যকলাপ সংগঠিত করা হয় জেলার বিভিন্ন স্কুলগুলোতে। এছাড়াও প্রশাসনিক তরফে বিভিন্ন পঞ্চায়েতে, শহরে, উপূকুল বিভাগে গাছের চারা পোঁতা, বনভূমি সংরক্ষণ, গাছের পরিচর্যার মতো একাধিক পদক্ষেপ গৃহীত হয়ে থাকে। ২০১৯ সালের তথ্যনুযায়ী বনসৃজনের উদ্দেশ্যে রাজ্যজুড়ে ২ কোটি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। বাঁকুড়া বন বিভাগে গত বছর প্রায় ৩৪ লক্ষ চারা পোঁতা হয় বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন স্কুলগুলোতেই প্রতিবছর গাছের চারা লাগান হয়। নাগরিকদের বিনামূল্যে গাছের চারা দেওয়া হয়ে থাকে বনবিভাগ থেকে। শহর, গ্রাম, মফস্বলের যে সমস্ত উর্বরা জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে সেসব জায়গাতেও গাছ লাগানো হয়ে থাকে।

অরণ্য সপ্তাহ পালনের উদ্দেশ্যই হল সবুজের বিস্তার বৃদ্ধি ঘটানোর সাথে সাথে আগামী প্রজন্মকেও গাছ, অরণ্য এবং বন্যপ্রাণীর প্রয়োজন সম্পর্কে অবগত করানো। আমাজন রেইন ফরেস্ট, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ, অস্ট্রেলিয়ার এডিলেড হিলস এবং ক্যাংগারু আইল্যান্ডের বিস্তীর্ণ জঙ্গল এবং বন্য প্রাণীর জীবন যখন ভীষণভাবে সংশয়ে রয়েছে তখন ‘যৌবনের দূত’কেই কাণ্ডারি হয়ে উঠতে হবে।

 উপসংহার: –

বিগত কয়েক বছর ধরে চারা রোপণের দিকে নজর দিলেও খোদ কলকাতার বুকে দেখা যায় একের পর মৃত বৃক্ষের সারি। ২০১৫-র জুলাই মাসে কলকাতা পুরসভার তরফ থেকেই জানা যায় ১৩৭টি গাছ উপড়ে গেছে। পূর্ণবয়স্ক হবার আগেই মারা পড়ছে একাধিক গাছ। অথচ সরকারীর নির্দেশে এবং পদক্ষেপে সবুজায়ন হচ্ছে শহরের বুকে বলে দাবি করা হয়। অরণ্য সপ্তাহ উৎসবের দোহাই দিয়ে প্রচুর চারা লাগালেও যদি যত্ন না নেওয়া হয় তবে আদতে এই উৎসব-সমারোহের আদৌও কতটা যুক্তিকতা আছে সেই বিষয়ে সত্যিই প্রশ্ন ওঠে। বিভিন্ন সরকারের নীতি, আইন, বিল, বন জরিপ করার প্যারামিটারগুলোর সংজ্ঞা বদলে দিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের উচ্চতর স্থান দিতে গিয়ে আদতে এই সমস্ত বালখিল্যতার ফলে মানব সমাজ, বাস্তুতন্ত্র আসলে এক সুগভীর খাঁদের কিনারায় দাঁড়িয়েছে। আসামের যাদব মোলাই পায়েং স্বচেষ্টায় বিগত ৩০ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের থেকে জোরহাট পর্যন্ত ১৩৬০ একর জমি জুড়ে মনুষ্য সৃষ্ট অরণ্যের জন্ম দিয়েছেন, যা ‘মোলাই বন’ নামে প্রসিদ্ধ। হুলিকাল এবং কুদুরের হাইওয়ে  জুড়ে সালুমারাদা থিম্মাকা এবং ওঁর স্বামী দুজনের যুগ্মভাবে ৩৮৪টি বট গাছ রোপণ করেছেন। সাধারণ নাগরিক যদি পরিবেশের জন্য কাজ চালিয়ে যেতে পারেন কেবলমাত্র ইচ্ছের ওপর ভর করে তবে আমাদের রাষ্ট্রনায়কদের ঘুম ভেঙ্গে উৎসব অনুষ্ঠানের দেখন্দারি বন্ধ করে সবুজের গুরুত্ব বুঝে নিয়ে এবং কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের হাতে আমাদের দেশের বন-সম্পদ তুলে দেওয়া বন্ধ করে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহন করলে অচিরে সকলেরই মঙ্গল হবে।


Nature Talkies declaration: This content is written by the contributor. If you have any suggestion or want to update more information or report us then contact at info@naturetalkies.com  

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Bengali Edition

বরন্তিঃ ছবির মতো সাজানো পুরুলিয়ার ছোটো একটি আদিবাসী গ্রাম

Published

on

বরন্তি
Image credit : Wikipedia
Share This Article

বি জীবনানন্দ লিখেছিলেন “বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর” । পাহাড়-পর্বত-সমুদ্র-জঙ্গলের আবরণে ভূষিত ভারতের পূর্বাংশের অন্যতম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। বাংলার শঙ্খচিল তাই কেবলমাত্র কবি বা সাহিত্যিকের লেখায় নয়, বিভিন্ন সিনেমার দৃশ্যেও দর্শকের মগজে এবং মননে নিজের রূপে স্বমহিমায় ধরা দিয়েছে। এই রূপের মোহেই পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে ভ্রমণ পিপাসু মানুষের আগমন ঘটেছে এ রাজ্যে। একাত্ম হয়েছেন স্থানীয় মানুষ, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের সাথে। আপন করে নিয়েছেন এই স্থানের জল-বায়ু, খাদ্যরীতি এবং উৎসব আয়োজনকে। এ বাংলার বুকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর লাল মাটির দেশ পুরুলিয়া। পুরুলিয়া জেলাতে অবস্থিত বরন্তি।  ছবির মতো সুন্দর জায়গাটি আসলে একটি আদিবাসী গ্রাম। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও বরন্তির শান্ত সমাহিত ভাব এখনো বর্তমান।

আরো পড়ুন : মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ

পুরুলিয়ার ইতিহাসঃ-

পঞ্চ শতকের জৈন ভাগবতী-সূত্র অনুযায়ী পুরুলিয়া ১৬ তম মহাজনপদের মধ্যে অন্যতম ছিল এবং প্রাচীনকালে ভজ্রভূমি নামে এক দেশের অন্তর্গত ছিল। ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বাংলা, বিহার এবং উড়িশ্যার দেওয়ানী লাভের আগে পর্যন্ত পুরুলিয়া নিয়ে সেরকম কিছু জানা যায় না। ১৮০৫ সালে ১৮ তম অধিবেশনে পুরুলিয়া সহ  ২৩ পরগণা নিয়ে জঙ্গল মহল জেলা তৈরি হয়। ১৮৩৩ সালে ১৩ তম অধিবেশনে এই জেলা ভেঙ্গে মানভুম জেলা তৈরি হয়, জেলা সদর দপ্তর থাকে মানবাজারে।

জঙ্গল মহল অঞ্চলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব অধিক থাকার ফলে সমস্ত অঞ্চলটিকে অনেক গুলো ছোটো ছোটো জেলায় ভাগ করে যেমন- পাঞ্চেত [১৭৭৩], জঙ্গল মহল [১৮০৫], মানভূম [১৮৩৩] ।

তবে এই মানভূম জেলাটি আয়তনে অত্যন্ত বড়ো ছিল [প্রায় ৭৮৯৬ স্কোয়ার মাইল], বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ও বর্ধমান; ঝাড়খণ্ড রাজ্যের ধানবাদ ও ধলভূম এবং উড়িষ্যার সারাইকেলা ও খারস্বান অঞ্চলগুলোও এই জেলার অন্তর্গত ছিল।

১৮৩৮ সালে জেলা সদর দপ্তর পুরুলিয়াতে স্থানান্তর করা হয়। এরপরেই জেলাটিকে নিয়মিত প্রশাসনের শাসন পদ্ধতিতে থেকে প্রত্যাহার করা হয় এবং দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের গভর্নর জেনারেলের নিকটে প্রিন্সিপাল অ্যাসিস্টেন্স নামে এক আধিকারিকের অধীনে নিযুক্ত করা হয়। ১৮৫৪ সালে ২০ তম অধিবেশনে ‘প্রিন্সিপাল এজেন্ট’ কর্মকর্তা পদটি বদল করে ‘ডেপুটি কমিশনার’ নাম করে রাখা হয়।

মানভূম জেলাকে ১৮৪৫, ১৮৪৬, ১৮৭১ আর ১৮৭৯ সালে আবার বিভক্ত করা হয় যার ফলে এর আয়তন কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৪১১২ স্কোয়ার মাইল।

১৯০৫ সালে বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলন শুরু হয়। বাংলার বিভাজন থামে ১৯১১ সালে আর ১৯১২ সালে বিহার-উড়িষ্যার সৃষ্টি হয়। মানভূমকে বিহার-উড়িষ্যা ভুক্ত করা হলে মানভূমে বসবাসকারী বাঙলাভাষীদের মধ্যে নিজের মাতৃভাষা বাংলার ওপর হিন্দী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা ভাষা আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ করে।

অবশেষে ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুর্ন গঠন অধিনিয়ম এবং বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ [রাজ্য সীমানা হস্তান্তর] অধিনিয়ম ১৯৫৬, অনুযায়ী বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের মাঝে  মানভূম জেলাটি বিভক্ত হয়। ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বরে জন্ম হয় স্বতন্ত্র পুরুলিয়া জেলার।

আরো পড়ুন :ইকো পর্যটন উপভোগের ১০টি কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ প্রেমীদের জন্য!

পুরুলিয়ার ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যঃ-

পুরুলিয়ার ভৌগোলিক আয়তন হল ৬২৫৯ স্কোয়ার কিমি। পৌরসভা আর অপৌরসভা মিলিয়ে শহুরে অঞ্চলের আয়তন হল ৭৯.৩৭ স্কোয়ার কিমি [ মোট এলাকার ১.২৭%] এবং গ্রামীণ অঞ্চল হল ৬১৭৯.৬৩ স্কোয়ার কিমি অঞ্চল। পুরুলিয়া সদর পূর্ব, পুরুলিয়া সদর পশ্চিম এবং রঘুনাথপুর সহ তিনটি প্রাশাসনিক মহকুমা নিয়ে জেলা সদর দপ্তরটি পুরুলিয়াতে রয়েছে।

পুরুলিয়া রুক্ষ ঢেউ খেলানো ছোটো পাহাড় বিস্তৃত পশ্চিম এবং দক্ষিণ অংশে। পুর্বস্থ মালভূমি আর পাহাড়ের কৃষি জলবায়ু এবং ছোটোনাগপুর দক্ষিণ আর পশ্চিমবঙ্গ মালভূমি নিয়ে জেলাটি অবস্থিত। এটি ক্ষরা প্রবণ এলাকা সত্ত্বেও খানিক বৃস্টিপাত হয়ে থাকে। ১১০০-১৫০০ মিমি বৃস্টিপাত সারাবছর ধরে হয়ে থাকে। উচ্চ বাষ্পীভবন এবং নিম্ম বৃষ্টিপাতের কারণে এই জেলাতে একটি প্রায় গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় আবহাওয়া রয়েছে। বর্ষাকালে বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা অনেক বেশি থাকে, প্রায় ৭৫% থেকে ৮০%। গ্রীষ্মকালে এই পরিমাণ এসে দাঁড়ায় ২৫% থেকে ৩০%-এ। শীতকালে সর্ব নিম্ম তাপমাত্রা থাকে ৭ ডিগ্রী এবং গ্রীষ্মকালে থাকে প্রায় ৫০ ডিগ্রী। এই অঞ্চলে প্রায়ই  ভূমিক্ষয় হয়ে থাকে যার ফলে উপত্যকার দিকে প্রচুর পরিমাণে উর্বরা জমি তলিয়ে গেছে। অধিকাংশ অঞ্চল কৃষিকাজ করার অযোগ্য। সাঁওতাল, মুন্ডা, ভুমিজ, বিরহড়, খারিয়া, শবর জাতির আদিবাসিদের বসবাস এই জেলায়।

বরন্তিঃ-

পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরের কাছে বরন্তি হল একটি  ছোটো আদিবাসী গ্রাম। এই গ্রামকে ঘিরেই  গড়ে উঠেছ পুরুলিয়ার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। লাল মাটির রাস্তা, শাল-পিয়ালের জঙ্গল, শীতকালে ফুঁটে থাকা পলাশ ফুল- সব মিলিয়ে অপূর্ব সুন্দর এই উপজাতীয় গ্রাম। একদিকে রয়েছে বিহারিনাথ, অন্যদিকে গড়পঞ্চকোট পাহাড়। রয়েছে ছোটো পাহাড় ঘেরা সুবৃহৎ  বরন্তি লেক, গিয়ে মিশেছে দিগন্তের সাথে। বরন্তি লেকের পোশাকি নাম রামচন্দ্র পুর, একটি বিখ্যাত জলাধার। পর্যটন কেন্দ্র হলেও এখনো আধুনিকতার আঁচড় লাগে নি এই জায়গায়। মাটির বাড়ি, সাঁওতালি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং তাঁদের সরল জীবনযাত্রা বর্তমান।

বরন্তি থেকে কাছেই পাঞ্চেত পাহাড়। পাঞ্চেত পাহাড়ে পাদদেশে অবস্থিত গড়পঞ্চকোট, একটি ঐতিহাসিক স্থান। সুপ্রাচীন মন্দির, দুর্গ আরোও নানা রকমের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এই স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিখ্যাত পঞ্চ রত্ন মন্দিরটিকেও পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। বরন্তি থেকে গড়পঞ্চকোটের দূরত্ব মাত্র ১২ কিমি।

জয়চন্ডী পাহাড়ও একটি অসামান্য পর্যটন কেন্দ্র। পাহাড়ের চূড়োয় রয়েছে চন্ডী মন্দির। রয়েছে সিমাফোর টাওয়ার। টেলিগ্রাম জামানায় এই সিমাফোর টাওয়ারটি বিখ্যাত ছিল। বরন্তি থেকে জয়চন্ডী পাহাড়ের দূরত্ব ২১ কিমি।

শীতকালে বিদেশ থেকে অসংখ্য পরিযায়ী পাখি এসে ভীড় করে বরন্তিতে। এই স্থানে শীতকাল হল পর্যটনের জন্য শ্রেষ্ঠ সময়। পাহাড় ঘেরা বরন্তি লেকের সামনে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য অসীম সুন্দর প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে।

কি করে যাবেন এবং থাকার জায়গাঃ-

কলকাতা থেকে বরন্তির দূরত্ব ২৩৫ কিমি। গাড়ি নিয়ে ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে প্রথমে আসানসোল থেকে মুরাডি হয়ে বরন্তি যাওয়া যায়।

বরন্তি গ্রামের সবথেকে কাছের রেল স্টেশন হল মুরাডি। মুরাডি থেকে গ্রামের দূরত্ব ৬ কিমি। বরন্তি যাওয়ার জন্য স্টেশনের সামনেই রিক্সা, ট্রেকার থাকে।

বরন্তিতে লেকের কাছেই বিভিন্ন আধুনিক সুব্যবস্থা সম্পন্ন রিসর্ট রয়েছে। অনলাইন বুকিং করার সুবিধে সহ কন্টিনেল্টাল, চাইনিজ, বাঙালী খাবার, স্টেশনে পিক আপ এবং ড্রপ করে দেওয়ার সুবিধে, তাঁবু পিচ করার জায়গা, বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুবিধে রয়েছে। কেউ চাইলে ট্রেকিং এবং রক ক্লাইম্বিং করার গাইডের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয় রিসর্ট থেকেই।

উপসংহারঃ

পুরুলিয়া নিঃসন্দেহেই অনিন্দ্য সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র। আদিবাসী গ্রাম, তাঁদের জীবনযাত্রা, শিল্প, ভাষা প্রভৃতি স্বতন্ত্র। ছৌ নাচ, টুসু পরব বিখ্যাত। রুক্ষ পরিবেশেও রাঢ় বাংলার লাল মাটির রাস্তা যেন আদরের প্রলেপ দিয়ে যায়। গভীর নীল রঙের জলে বরন্তি লেক পরমা সুন্দরী রাজকন্যে হলে শ্বাপদ সংকুল জঙ্গলে ঘেরা পাহাড় হল বরন্তি রাজকন্যের পাহারাদাড়। বরন্তি নদীতে বাঁধ দেওয়ার ফলেই এই লেকের সৃষ্টি। আবার দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলো পড়ে লেকের জলের রঙ এক এক রকম হয়ে থাকে। আদিবাসিদের অনাম্বড়হীন জীবনের ছাপ ধরা পড়ে গ্রামগুলোর বুকে হেঁটে এলেই। ভ্রমণ আমাদের শেখায় হৃদয় দ্বার উন্মুক্ত করতে। সামাজিক ভেদভাগ ভুলে পর্যটকেরা সকলের সাথেই আত্মীয়তার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। পর্যটন আমাদের শেখায়  মানবিকতার ধর্ম।

সমগ্র পুরুলিয়া জুড়ে দর্শনীয় স্থানের সংখ্যা রয়েছে প্রচুর। সরকার থেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই সমস্ত স্থানের সঠিক রক্ষণাবেক্ষন করে বিশ্ববাসীর সামনে তা তুলে ধরা প্রয়োজন। গড়পঞ্চকোটের যে সমস্ত প্রত্নতাত্বিক ধংসাবশেষ রয়েছে তার দিকেও সরকারী তরফে নজর দেওয়া উচিত। আমাদের কাছে যে সম্পদ আছে খুব দেরি হওয়ার আগেই তার মর্ম আমাদের বুঝতে হবে।

Get more details: The West Bengal Tourism Development Corporation Limited (WBTDCL).

বি দ্রঃ বর্তমানে দেশের অনেক জায়গাতেই “কোভিড ১৯” এর জন্যে ভ্রমনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই ভ্রমণের আগে সরকারি নির্দেশ ও নিয়মাবলী মেনে চলাটাই বাঞ্চনীয় !

Continue Reading

Bengali Edition

বন্যপ্রানী অভয়ারণ্য : বাংলাদেশের দশটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

Published

on

বন্যপ্রানী অভয়ারণ্য
Image credit : Wikipedia
Share This Article

বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বা Wildlife Sanctuary এক কথায় বনের প্রাণীগুলোর জন্য নিরাপত্তার অপর নাম। নির্দিষ্ট আয়তন জুড়ে যে এলাকায় বন্যপ্রাণীদের নিরাপত্তা, খাদ্যসংস্থান ও প্রজননের জন্য তাদেরকে অবাধ বিচরণের সুযোগ দেওয়া হয় সেটাই ‘বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য’ হিসেবে পরিচিত। দিনে দিনে মানুষ যতো আধুনিক সভ্যতার দিকে এগোচ্ছে ততোই মানুষ প্রকৃতির জন্য হুমকি স্বরূপ বিরাজ করছে, প্রাণী হত্যা থেকে প্রাণী পাচার কোনো জায়গাতেই এখন পিছিয়ে নেই তারা। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে একটা সময় পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুল বিলীন হয়ে যাবে, এতে করে বাস্তুতন্ত্রের যে ভারসাম্য বর্তমানে আছে সেটা আর থাকবে না এবং মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই প্রাণীরক্ষার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে অভয়ারণ্য দূর্দান্ত! 

আসুন জেনে নিই বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ১০টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সম্পর্কে- 

১০. চর কুকড়ি-মুকড়ি 

প্রায় ৪০ হেক্টর আয়তনের এই অভয়ারণ্যটি বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোটো বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। বরিশাল বিভাগের অন্তর্গত ভোলা জেলার একেবারে দক্ষিণ দিকে চরটির অবস্থান, স্থানীয়ভাবে চরটির নাম ‘কুকড়ি-মুকড়ি’। চরটির আরেক নাম “দ্বীপকন্যা”। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় কয়েকশো’ বছর আগে চরটি জেগে ওঠে, ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ একে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। চরটিকে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি হরিণ, লাল কাঁকড়া, বুনো মহিষ, বানর, বনবিড়াল, উদবিড়াল, শেয়াল, বনমোরগসহ আরো নানাপ্রজাতির অতিথি পাখি ও বন্যপ্রাণী রয়েছে। মনজুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য ও পরিবহন ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় এটি অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও দিনে দিনে জনপ্রিয় হচ্ছে।  

৯. চুনতি অভয়ারণ্য 

বাংলাদেশের অন্যতম বড়ো শহর চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে চুনতি অভয়ারণ্য অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় ৭ হাজার ৭৬৪ হেক্টর। প্রচুর টিলা, গভীর ও অগভীর খাদ এবং পাহাড়ী ভূপ্রকৃতি মিলিয়ে এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটির ভূমি যথেষ্ট বৈচিত্র্যময় বটে। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে এশীয় হাতির চলাচল অবাধ করতে এই অভয়ারণ্য করিডোরের মতো কাজ করে। এই বনে প্রায় ১২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ দেখা যায় যার মধ্যে ৪৫ প্রজাতি উঁচু উদ্ভিদের। গর্জন, রাকতান, জাম, উরি আম, চাপালিশ, শিমুল, কড়ই ছাড়াও প্রচুর ভেষজ উদ্ভিদ এই বনের অন্যতম আকর্ষণ। পূর্বে এই অভয়ারণ্যে প্রায় ১৭৮ প্রজাতির জীবজন্তু ও পাখি পাওয়া যেতো যার মধ্যে উভচর, স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, পাখি সবই ছিলো। বর্তমানে দূষণসহ অন্যান্য কারণে এর জীববৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। 


আরো পড়ুন : সীতাকুন্ড :এশিয়ার বৃহত্তম বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক !

৮. দুধ্মুখী অভয়ারণ্য 

বাংলাদেশের দক্ষিণে খুলনা বিভাগের অন্তর্গত বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত অন্যতম দর্শনীয় স্থান দুধমুখী অভয়ারণ্য, এটি মূলত একটি বিস্তৃত জলাভূমি। ২০১২ সালে এলাকাটি অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত হয়। প্রায় ১৭০ হেক্টরের মতো জায়গা নিয়ে অভয়ারণ্যটি অবস্থিত। শকুনের নিরাপদ এলাকা-২ তফসিল অনুসারে এটি শকুনের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে স্বীকৃত। 

 ৭. হাজারিখিল অভয়ারণ্য  

চট্টগ্রাম শহর থেকে উত্তরে রামগড়-সীতাকুন্ড বনাঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত বিস্তীর্ণ হাজারিখিল অভয়ারণ্য। প্রায় ১১৮ হেক্টর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি হাজারো জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। এ অভয়ারণ্যে প্রায় ১২৩ প্রজাতির পাখি, মথুরা, কাঠময়ূর, কাউ ধনেশ ও হুতুম পেঁচা আছে। পাখির বিশাল সংগ্রহের জন্য একে মাঝারি আকারের একটি ‘পক্ষীরাজ্য’ বল্লেও বোধহয় বোধহয় ভুল হবে না। বিশাল বনভূমি ও অনুকূল পরিবেশ থাকায় এই বনে এমন কিছু পাখি পাওয়া যায় যেগুলো কিনা সচরাচর আমরা অন্যান্য কোনো বনাঞ্চলে দেখতে পাই না; এর মধ্যে আছে হুদহুদ, চোখ গেল, নীলকান্ত, বেঘবৌ, আবাবিল। এছাড়াও পরিযায়ী পাখির জন্য এই অভয়ারণ্য একটি সত্যিকার ‘অভয়’! ২০১০ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। 

৬. টেকনাফ গেম রিজার্ভ 

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন একটি অভয়ারণ্য এই টেকনাফ গেম রিজার্ভ, ১৯৮৩ সাল থেকে বন্য হাতির অভয়ারণ্য হিসেবে এটি প্রসিদ্ধ। বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় টেকনাফ উপদ্বীপে এর অবস্থান। প্রায় ১১ হাজার ৬১৫ হেক্টর জায়গাজুড়ে এটি বিস্তৃত। 

বাংলাদেশের মধ্যে সর্বাধিক জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অভয়ারণ্য হিসেবে ধরা হয় টেকনাফ গেম রিজার্ভকে। এই বনে প্রায় ২৯০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৫৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৮৬ প্রজাতির উদ্ভিদ, উভচর ও সরীসৃপ। বাংলাদেশে বসবাস করা বুনো হাতির প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ টেকনাফের এই অভয়ারণ্যে বাস করে। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ কুদুম গুহা বা বাদুড় গুহা। 

৫. সাঙ্গু অভয়ারণ্য 

বান্দরবান জেলার পার্বত্য এলাকাজুড়ে অবস্থিত সাঙ্গু-মাতামুহুরী বনাঞ্চল, এর মধ্যে দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্রোতধারা বয়ে চলেছে সাঙ্গু নদী। লামা উপজেলার ২৩৩১ হেক্টর জমির উপর এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি অবস্থিত। এই অঞ্চলে হাতি, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ভাল্লুকসহ নানা বিরল প্রাণীর বিচরণ দেখা যায়। ২০১০ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ একে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে, এর সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন করে থাকে বন বিভাগের অধীনস্থ লামা বন বিভাগ। শুধুমাত্র বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবেই নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছেও এর যথেষ্ট কদর রয়েছে। 

৪. ফাঁসিয়াখালী অভয়ারণ্য 

২০০৭ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটিকে স্বীকৃতি দেয়। প্রায় ১ হাজার ৩০২ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই অভয়ারণ্যে স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম ইকোপার্ক, যা কিনা পরিবেশপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অন্যতম একটি অ্যাডভেঞ্চারের জায়গা। বন প্রকৃতি অনুযায়ী এটি ক্রান্তীয় চিরহরিৎ বন, গর্জন গাছের বুবিশাল ছায়ায় চলতে চলতে দেখা মিলবে বুনো শুয়োর, চিতাবাঘ, শুয়োর ও বুনো হাতির। এছাড়াও এর ঘন বনের মধ্যে দেখা মিলবে বিরল প্রজাতির শুশুক, উলটো লেজ বানরের। 

৩. সোনারচর অভয়ারণ্য 

পটুয়াখালী জেলার রাঙাবালী উপজেলার অন্তর্গত সোনারচর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য দেশীয় পর্যটকের কাছে অন্যতম দর্শনীয় একটি স্থান। প্রায় ২ হাজার ২৬ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই অভয়ারণ্যে একইসাথে সমুদ্রসৈকত ও বনাঞ্চলের হাতছানি পাওয়া যাবে। শকুনের নিরাপদ এলাকা-১ তফসিল অনুযায়ী এটি শকুনের জন্য অভয়ারণ্য হিসেবে বিবেচিত। 

সমুদ্র সৈকতের পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত এখানকার একটি অন্যতম আকর্ষণ, সাথে আছে অজস্র লাল কাঁকড়ার গালিচা! সূর্যের প্রখর রোদ যখন তীরের বালির উপর পড়ে তখন তীরের বালি চমকে একটি সোনালী আভার সৃষ্টি করে, যার কারণে দূর থেকে দেখে মনে হয় এখানে সোনার প্রলেপ দেওয়া। এ কারণেই স্থানীয়রা এই জায়গার নাম দিয়েছে সোনারচর! 

২. রেমা কেলেঙ্গা অভয়ারণ্য 

সুন্দরবনের পর বাংলাদেশের সবচাইতে বড়ো প্রাকৃতিক বনভূমি হচ্ছে রেমা কেলেঙ্গা বনভূমি। সিলেটের হবিগঞ্জে অবস্থিত এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যে ভরপুর সমৃদ্ধ ও বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জায়গাব্যাপী বিস্তৃত এই বনভূমি একটি শুকনো ও চিরহরিৎ বন, বাংলাদেশ বন বিভাগ ১৯৮২ সালে এটিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়। 

১৬৭ প্রজাতির একটি বড়ো পক্ষীবাহিনীর বিচরণ এই রেমা কেলেঙ্গা অভয়ারণ্যে, যার মধ্যে ভীমরাজ, টিয়া, লালমাথা কুচকুচি, বসন্তবৌরি, মাছরাঙ্গা, সিপাহি বুলবুল অন্যতম। এছাড়াও আছে প্রায় ৬৩৮ প্রজাতির গাছপালা ও লতাগুল্ম। 

১. সুন্দরবন 

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ধরা হয় সুন্দরবনের দক্ষিণ অংশকে। সুন্দরবনের প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জায়গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃত, ব্যাপক প্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সুন্দরবনকে বাকি সবগুলো অভয়ারণ্য থেকে মৌলিক একটি পরিচয় দিয়েছে। এ বনে প্রায় ৫০০টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে যা কিনা সারাবিশ্বের মধ্যে এখানেই পাওয়া যায়। এছাড়াও আছে ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি। বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ সরীসৃপ, ৩৭ শতাংশ পাখি ও ৩৭ শতাংশ স্তন্যপায়ী এই সুন্দরবনেই বসবাস করে। বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি। 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হওয়ার সাথে সাথে বনাঞ্চলগুলো ব্যাপকভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণী বৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে পরম মমতায়, যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যগুলো। পর্যটক ও অধিবাসী সকলেরই উচিৎ এই এলাকাগুলোকে যথাযোগ্য মর্যাদায় সংরক্ষণ করা। কারণ ঝড়-তুফানে এই এলাকাগুলো যেভাবে ঢাল হয়ে দেশকে রক্ষা করে তেমনিভাবে বস্তুতন্ত্রকে আগলে রাখে পরম মমতায়! আজন্ম ঋণ তাই প্রকৃতির কাছে মানবজাতির! 

বি দ্রঃ বর্তমানে দেশের অনেক জায়গাতেই “কোভিড ১৯” এর জন্যে ভ্রমনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই ভ্রমণের আগে সরকারি নির্দেশ ও নিয়মাবলী মেনে চলাটাই বাঞ্চনীয় !

Continue Reading

Bengali Edition

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদঃ- একটি ঐতিহাসিক ইকো পর্যটন কেন্দ্র

Published

on

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ
Share This Article

দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ অবসর যাপনের জন্য সর্বদা বেঁছে নিয়েছে পর্যটনকে। বিভিন্ন  ছুটিতেই পর্যটন  হোক বা ছাত্রাবস্থার শিক্ষামূলক ভ্রমণ, সকলেই বিপুলা এই দেশের নদ-নদী, অরণ্য- পর্বত, সাগর-মরুভূমি, ঐতিহাসিক স্থানের তাৎপর্য এবং প্রয়োজনীতা মেনে নিয়েছে। অতীত অগ্রাহ্য করে কখনোই বর্তমানকে জানা যায় না। তাই আমাদের সকলেরই  ঐতিহাসিক স্থানগুলো ভ্রমনের আবশ্যকতা আছে। দেশ আর দশের কথা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি জানতে ভ্রমন প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে মুর্শিদাবাদ অন্যতম। হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া, মতিঝিল, হিরাঝিল প্রভৃতি নানা দ্রষ্টব্য স্থান রয়েছে। মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ জেলার ঐতিহাসিক স্থানের সাথে সাথে একটি ইকো পর্যটন কেন্দ্রও।

মুর্শিদাবাদের ইতিবৃত্তঃ-

পুর্বে এই শহরের নাম ছিল মুখসুদাবাদ। নবাব ঔরঙ্গজেব তৎকালীন বাংলা প্রদেশের জন্য একজন সুচারু দক্ষ আর সৎ দেওয়ান খুঁজছিলেন, সেই সময়েই তাঁর নজরে আসেন মির্জা হাদি, আর কিছু বছর পরেই সমস্ত দেশ যাকে চিনবে মুর্শিদ কুলি খাঁ নামে। ১৭০০ দিল্লি থেকে মির্জা হাদি তৎকালীন বাংলা প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় আসেন বাংলার দেওয়ান এবং মুখসুদাবাদের ফৌজদার হিসাবে।

মির্জা হাদির জীবন সম্পর্কে বহুল কথা প্রচলিত আছে। কোথাও বলা আছে মুঘল শাসনকালের এক উচ্চপদস্থ প্রাক্তন কর্তা ইস্ফানের হাজি শাফি তাঁকে ইরান দেশে নিয়ে যান এবং অভিভাবক হিসেবে জত্ন-লালন করার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় শিক্ষাদান করেন। এরপর  হাজি শাফির মৃত্যুর পর মির্জা হাদি ভারতে ফিরে এসে মুঘল সরকারের অধীনে কাজ শুরু করেন। নিজের দক্ষতার জন্যই তিনি নবাবের সুনজরে পড়েন  ১৭০০ সালে নবাব ঔরঙ্গজেব তাঁকে কার্তালাব খাঁ উপাধি দান করেন। তবে নবাবের বিশ্বস্ত এবং কাছের মানুষ হয়ে ওঠার ফলে নবাব পৌত্র আজিম-উশ-শানের হিংসের শিকার হন মির্জা হাদি। এমনকি তাঁর প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দেয়। তার ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ১৭০৪ সালে ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে আনা হয় মুখসুদাবাদের গঙ্গা নদীর তীরে। তাঁর সততা আর পরিশ্রম দেখে ঔরঙ্গজেব তাঁকে মুর্শিদ কুলি খাঁ উপাধি দেন এবং বাংলা, বিহার আর উড়িষ্যার ডেপুটি হিসেবে নিযুক্ত করেন। এরপরেই মির্জা হাদি নিজের উপাধি স্বরূপ মুখসুদাবাদের নাম বদলে মুর্শিদাবাদ রাখেন। ১৭১৩ সালে বাংলা প্রদেশের নায়েব নাজিম হিসেবে তাঁকে নিযুক্ত করা হয় এবং ১৭১৭ তিনি বাংলা বিহার আর উড়িষ্যার সুবেদার হন। এই ভাবেই বাংলায় নবাবি শাসনের গোড়াপত্তন ঘটে এবং জন্ম নেয় মুর্শিদাবাদ। উল্লেখ্য ১৭৫৬ সালে আলিবুর্দি খাঁর দৌহিত্র  সিরাজ-উদ-দৌল্লা নবাব হন। তিনিই ছিলেন  বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।

এই আমলেই গড়ে ওঠে একের পর এক সুদৃশ্য প্রাসাদ, উদ্যান, মসজিদ, মন্দির, সমাধি স্থল। গজিয়ে ওঠে নানা লৌকিক-অলৌকিক গল্প-কথা, ভাগীরথির তীর ধরে হেঁটে গেলে যা আজোও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়।

মুর্শিদাবাদের জনপ্রিয় স্থানগুলো হল- হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া ও মদিনা, কাটরা মসজিদ, মতিঝিল পার্ক, জগত শেঠের বাড়ি, তোপখানা, খোসবাগ, বড়নগর রাণী ভবানীর মন্দির, রাধামাধব মন্দির, চক মসজিদ, নশীপুরের রাজবাড়ী, রোশনি বাগ, হীরাঝিল, আজিমুন্নেসা বেগমের সমাধি, জাফরাগঞ্জ সমাধি ক্ষেত্র প্রভৃতি।

 মতিঝিলের ইতিবৃত্তঃ-

মতিঝিল কথার অর্থ হল মুক্তোর ঝিল। আলিবুর্দি খাঁর জামাতা নৌজেশ আহমেদ খাঁ তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ আলিবুর্দি খাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগমের জন্য একটি অপূর্ব সুন্দর প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এই প্রাসাদের নাম ছিল সাংহী দালান, বর্তমানে একে কোম্পানী বাগ বলা হয়ে থাকে। এই প্রাসাদের তিনদিক ঘিরে ৩৫০ একরের একটি অশ্বক্ষুরাকৃতি জলাধার এবং আরেকদিক ছিল নগর সংলগ্ন। এই ঝিলটি বিখ্যাত ছিল Unino Margaritifera প্রজাতির সোনালি সাদা মুক্তোর চাষের  জন্য।  নৌজেশ আহমেদ খাঁ এবং ঘসেটি বেগম এই প্রাসাদেই বাস করতেন। তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন। এক্রামউদ্দৌলাকে দত্তক নিলেও কিছু বছর পরেই তাঁর মৃত্য ঘটে। পুত্রশোকাতুর নৌজেশ ১৭৫৫ সালেই মারা যান এবং এই মতিঝিলের সমাধি ক্ষেত্র কালা মসজিদে দত্তক পুত্রের পাশেই তাঁকে কবরস্থ করা হয়।

সাংহী দালান গড়ে তোলা হয়েছিল গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে সংগ্রহ করা কালো মার্বেল পাথর ব্যবহার করে। ১৭৫৭-১৭৮৬ সালে মতিঝিল ছিল বিভিন্ন লর্ড ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্টিংস সহ প্রমুখ  ইংরেজ কর্তাব্যাক্তিদের আস্তানা।

আমিনা বেগম এবং জৈন উদ-দ্দিন আহমেদ খাঁয়ের পুত্র তথা আলিবুর্দি খাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজ উদ-দৌল্লা এরপর সিংহাসনের অধিকার দেন। এই সিদ্ধান্তে যারপরনাই ক্ষুদ্ধ ঘসেটি বেগম নবাব-বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হন এই প্রাসাদ প্রাঙ্গনে বসেই।বলা যায় এই মতিঝিল চত্বরটিই হয়ে ওঠে সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মন্ত্রনালয়।  যুবক নবাব সিরাজকে উৎখাত করতে মীর জাফর, জগত শেঠ এবং ব্রিটিশদের মধ্যে ঘসেটি বেগম যোগসাজশ করেন নিজের প্রভূত সম্পদ এবং ক্ষমতার জেরে। ২৩ শে জুন ১৭৫৭ সালে মতিঝিল থেকেই পলাশির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌল্লা। মীর জাফরের নেতৃত্বাধীন নবাবের অধিকাংশ সৈন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ফলে অনিবার্য ভাবেই পতন হয় সিরাজের শাসনকালের।

মতিঝিলের সৌন্দর্য দেখেই ঈর্ষান্বিত সিরাজ তৈরি করেন হিরাঝিল। তবে এই কথা একবাক্যে স্বীকার করা যায় যে ভারতের শাসন ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পালাবদলের সাক্ষী এই মতিঝিল। এই প্রাঙ্গনকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ।

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদঃ-

ঘসেটি বেগমের মতিঝিল প্রাসাদ যদিও কালের প্রকোপে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে, কিন্তু সেই প্রাসাদকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বর্তমানে মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকে এটি কোম্পানি বাগ নামে পরিচিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন বিভাগের তত্ত্বাবধানে এই পার্কটি সুসজ্জিত হয়ে উঠেছে গোলাপ বাগান, পাতাবাহারি গাছ, মরশুমি ফুল, সবুজ ঘাসের নরম গালিচা এবং আরোও বিভিন্ন রকম গাছের সমারোহে। এছাড়াও সেখানে রয়েছে নবাবদের ও তাঁদের বংশের নানা মূর্তি, মিউজিক্যাল ফোয়ারা। রয়েছে আলো এবং শব্দের মাধ্যমে মুর্শিদাবাদের নানারকম ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা বিশেষ করে নবাব সিরাজ উদ-দৌল্লার পতনের ইতিবৃত্ত এখানে সুন্দর করে বর্ণনা করা হয়। সুদৃশ্য পাথর বিছানো রাস্তা চলে গেছে একেবেকে মতিঝিল পার্কের মধ্যে দিয়েই।

বাচ্চাদের জন্য রয়েছে দোলনা, সি-স, স্লিপার, টয়-ট্রেন, ড্রাগন ট্রেন সহ আরোও নানা রকম অ্যাডভেঞ্চার রাইড। পার্কের ভেতরে রয়েছে বেশ কিছু বিশ্রাম স্থল, পক্ষী আলোয়, ছবি তোলার জন্য সুদৃশ্য জায়গাও। সাইকেল, বিদ্যুৎ চালিত পরিবেশ বান্ধব গাড়ি রয়েছে, পর্যটকরা যা ভাড়া নিয়ে মতিঝিল পার্কের ভেতরে ঘুরতে পারেন। শীতকালে এই পার্কের লেকে পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে যায়। পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে সুদৃশ্য হোটেল ব্যবস্থা। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন বিভাগের নিজস্ব রিসর্ট আর হলিডে হোম এই পার্ক এর মধ্যেই অবস্থিত যা সুসজ্জিত বাগান এবং ফোয়ারা দ্বারা পরিবেষ্টিত। এছাড়া রয়েছে সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট মঞ্চ যার সংলগ্ম জমিতে ১০০ জন পর্যন্ত অতিথির স্থান সংকুলান সম্ভব। আরো ব্যবস্থার মধ্যে ১০০জনেরও বেশি পিকনিক করার স্থান, যে কোনো রকম গাড়ি স্বল্প অর্থের বিনিময়ে রাখার জায়গাও রয়েছে পার্কের মধ্যেই। পর্যটকদের জন্য মালপত্র রাখার জায়গাও আছে যেখানে প্রথম আগমনের সময়  অনুসারে স্বল্প মূল্যে ৬ ঘন্টা অবধি যেকোনো মালপত্র রাখা যায়।

কি করে যাবেনঃ-

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ থেকে মুর্শিদাবাদ রেল স্টেশনের দূরত্ব ২ কিমি এবং লালবাঘ কোর্ট রোড রেল স্টেশনের দূরত্ব ৩ কিমি। শিয়ালদহ বা কোলকাতা জংশন স্টেশন থেকে শিয়ালদহ-লালগোলা বিভাগের যে কোনো ট্রেন এ করে এই স্টেশন গুলিতে পৌছনো সম্ভব। শিয়ালদহ বা কোলকাতা জংশন স্টেশন থেকে দূরত্ব ১৯৭ কিমি।

নেতাজী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর মুর্শিদাবাদের সব থেকে নিকটতম বিমান বন্দর যার দূরত্ব পার্ক থেকে ২১০ কিমি।

এছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে বাস যাতায়াত করে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে। বাসে করে চার্চ মোড়ে, যার দূরত্ব পার্ক থেকে ১০কিমি অথবা বহরমপুরের পঞ্চাননতলা মোড়ে, যার দূরত্ব পার্ক থেকে ১৪কিমি নেমে বাকি পথ রিক্সা বা টাঙ্গা গাড়ি বা ট্যাক্সি করে যেতে হবে।

আরো পড়ুন : ইকো পর্যটন উপভোগের ১০টি কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ প্রেমীদের জন্য।

উপসংহারঃ-

এই মুর্শিদাবাদেই অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীন নবা্বী শাসনের সূর্য। শুরু হয় বাংলার বুকে ব্রিটিশরাজ। এই বাংলা থেকেই আবার জন্ম নিয়েছে একের পর এক বিপ্লবী। তাঁদের গৌরব গাঁথা অমলিন। রাজ্যের একাধিক স্থানে এরকমই অনেক ঐতিহাসিক সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে। বেশ কিছু নষ্ট হয়ে গেছে পরিচর্যার অভাবে। নাগরিক এবং সরকার দু’ তরফেরই উচিত এই সম্পদের প্রতি যত্নশীল হওয়া। ইকো পর্যটন করতে গিয়ে ঘোরার জায়গা এবং তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে দায়বদ্ধতা খুব দরকারী। যেখানে মর্জি নোংরা করা, থুতু ফেলা, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল ফেলার মতো কু-স্বভাব থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে।  পরিবেশ রক্ষা করার দায় আজ সমাজের প্রতিটি মানুষের। আজকে আমাদের পদক্ষেপের ফলেই এই বসুন্ধরা বাসযোগ্য হয়ে উঠবে আগামী প্রজন্মের জন্য

বি দ্রঃ বর্তমানে দেশের অনেক জায়গাতেই “কোভিড ১৯” এর জন্যে ভ্রমনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই ভ্রমণের আগে সরকারি নির্দেশ ও নিয়মাবলী মেনে চলাটাই বাঞ্চনীয় !

Continue Reading

Trending