মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদঃ- একটি ঐতিহাসিক ইকো পর্যটন কেন্দ্র - We Talk about Nature spankbang xxnx porncuze porn800.me
Connect with us

Bengali Edition

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদঃ- একটি ঐতিহাসিক ইকো পর্যটন কেন্দ্র

Published

on

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ
Share This Article

দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ অবসর যাপনের জন্য সর্বদা বেঁছে নিয়েছে পর্যটনকে। বিভিন্ন  ছুটিতেই পর্যটন  হোক বা ছাত্রাবস্থার শিক্ষামূলক ভ্রমণ, সকলেই বিপুলা এই দেশের নদ-নদী, অরণ্য- পর্বত, সাগর-মরুভূমি, ঐতিহাসিক স্থানের তাৎপর্য এবং প্রয়োজনীতা মেনে নিয়েছে। অতীত অগ্রাহ্য করে কখনোই বর্তমানকে জানা যায় না। তাই আমাদের সকলেরই  ঐতিহাসিক স্থানগুলো ভ্রমনের আবশ্যকতা আছে। দেশ আর দশের কথা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি জানতে ভ্রমন প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে মুর্শিদাবাদ অন্যতম। হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া, মতিঝিল, হিরাঝিল প্রভৃতি নানা দ্রষ্টব্য স্থান রয়েছে। মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ জেলার ঐতিহাসিক স্থানের সাথে সাথে একটি ইকো পর্যটন কেন্দ্রও।

মুর্শিদাবাদের ইতিবৃত্তঃ-

পুর্বে এই শহরের নাম ছিল মুখসুদাবাদ। নবাব ঔরঙ্গজেব তৎকালীন বাংলা প্রদেশের জন্য একজন সুচারু দক্ষ আর সৎ দেওয়ান খুঁজছিলেন, সেই সময়েই তাঁর নজরে আসেন মির্জা হাদি, আর কিছু বছর পরেই সমস্ত দেশ যাকে চিনবে মুর্শিদ কুলি খাঁ নামে। ১৭০০ দিল্লি থেকে মির্জা হাদি তৎকালীন বাংলা প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় আসেন বাংলার দেওয়ান এবং মুখসুদাবাদের ফৌজদার হিসাবে।

মির্জা হাদির জীবন সম্পর্কে বহুল কথা প্রচলিত আছে। কোথাও বলা আছে মুঘল শাসনকালের এক উচ্চপদস্থ প্রাক্তন কর্তা ইস্ফানের হাজি শাফি তাঁকে ইরান দেশে নিয়ে যান এবং অভিভাবক হিসেবে জত্ন-লালন করার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় শিক্ষাদান করেন। এরপর  হাজি শাফির মৃত্যুর পর মির্জা হাদি ভারতে ফিরে এসে মুঘল সরকারের অধীনে কাজ শুরু করেন। নিজের দক্ষতার জন্যই তিনি নবাবের সুনজরে পড়েন  ১৭০০ সালে নবাব ঔরঙ্গজেব তাঁকে কার্তালাব খাঁ উপাধি দান করেন। তবে নবাবের বিশ্বস্ত এবং কাছের মানুষ হয়ে ওঠার ফলে নবাব পৌত্র আজিম-উশ-শানের হিংসের শিকার হন মির্জা হাদি। এমনকি তাঁর প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দেয়। তার ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ১৭০৪ সালে ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে আনা হয় মুখসুদাবাদের গঙ্গা নদীর তীরে। তাঁর সততা আর পরিশ্রম দেখে ঔরঙ্গজেব তাঁকে মুর্শিদ কুলি খাঁ উপাধি দেন এবং বাংলা, বিহার আর উড়িষ্যার ডেপুটি হিসেবে নিযুক্ত করেন। এরপরেই মির্জা হাদি নিজের উপাধি স্বরূপ মুখসুদাবাদের নাম বদলে মুর্শিদাবাদ রাখেন। ১৭১৩ সালে বাংলা প্রদেশের নায়েব নাজিম হিসেবে তাঁকে নিযুক্ত করা হয় এবং ১৭১৭ তিনি বাংলা বিহার আর উড়িষ্যার সুবেদার হন। এই ভাবেই বাংলায় নবাবি শাসনের গোড়াপত্তন ঘটে এবং জন্ম নেয় মুর্শিদাবাদ। উল্লেখ্য ১৭৫৬ সালে আলিবুর্দি খাঁর দৌহিত্র  সিরাজ-উদ-দৌল্লা নবাব হন। তিনিই ছিলেন  বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।

এই আমলেই গড়ে ওঠে একের পর এক সুদৃশ্য প্রাসাদ, উদ্যান, মসজিদ, মন্দির, সমাধি স্থল। গজিয়ে ওঠে নানা লৌকিক-অলৌকিক গল্প-কথা, ভাগীরথির তীর ধরে হেঁটে গেলে যা আজোও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়।

মুর্শিদাবাদের জনপ্রিয় স্থানগুলো হল- হাজারদুয়ারি, ইমামবাড়া ও মদিনা, কাটরা মসজিদ, মতিঝিল পার্ক, জগত শেঠের বাড়ি, তোপখানা, খোসবাগ, বড়নগর রাণী ভবানীর মন্দির, রাধামাধব মন্দির, চক মসজিদ, নশীপুরের রাজবাড়ী, রোশনি বাগ, হীরাঝিল, আজিমুন্নেসা বেগমের সমাধি, জাফরাগঞ্জ সমাধি ক্ষেত্র প্রভৃতি।

 মতিঝিলের ইতিবৃত্তঃ-

মতিঝিল কথার অর্থ হল মুক্তোর ঝিল। আলিবুর্দি খাঁর জামাতা নৌজেশ আহমেদ খাঁ তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ আলিবুর্দি খাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা মেহেরুন্নেসা ওরফে ঘসেটি বেগমের জন্য একটি অপূর্ব সুন্দর প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এই প্রাসাদের নাম ছিল সাংহী দালান, বর্তমানে একে কোম্পানী বাগ বলা হয়ে থাকে। এই প্রাসাদের তিনদিক ঘিরে ৩৫০ একরের একটি অশ্বক্ষুরাকৃতি জলাধার এবং আরেকদিক ছিল নগর সংলগ্ন। এই ঝিলটি বিখ্যাত ছিল Unino Margaritifera প্রজাতির সোনালি সাদা মুক্তোর চাষের  জন্য।  নৌজেশ আহমেদ খাঁ এবং ঘসেটি বেগম এই প্রাসাদেই বাস করতেন। তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন। এক্রামউদ্দৌলাকে দত্তক নিলেও কিছু বছর পরেই তাঁর মৃত্য ঘটে। পুত্রশোকাতুর নৌজেশ ১৭৫৫ সালেই মারা যান এবং এই মতিঝিলের সমাধি ক্ষেত্র কালা মসজিদে দত্তক পুত্রের পাশেই তাঁকে কবরস্থ করা হয়।

সাংহী দালান গড়ে তোলা হয়েছিল গৌড়ের ধ্বংসাবশেষ থেকে সংগ্রহ করা কালো মার্বেল পাথর ব্যবহার করে। ১৭৫৭-১৭৮৬ সালে মতিঝিল ছিল বিভিন্ন লর্ড ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্টিংস সহ প্রমুখ  ইংরেজ কর্তাব্যাক্তিদের আস্তানা।

আমিনা বেগম এবং জৈন উদ-দ্দিন আহমেদ খাঁয়ের পুত্র তথা আলিবুর্দি খাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজ উদ-দৌল্লা এরপর সিংহাসনের অধিকার দেন। এই সিদ্ধান্তে যারপরনাই ক্ষুদ্ধ ঘসেটি বেগম নবাব-বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হন এই প্রাসাদ প্রাঙ্গনে বসেই।বলা যায় এই মতিঝিল চত্বরটিই হয়ে ওঠে সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মন্ত্রনালয়।  যুবক নবাব সিরাজকে উৎখাত করতে মীর জাফর, জগত শেঠ এবং ব্রিটিশদের মধ্যে ঘসেটি বেগম যোগসাজশ করেন নিজের প্রভূত সম্পদ এবং ক্ষমতার জেরে। ২৩ শে জুন ১৭৫৭ সালে মতিঝিল থেকেই পলাশির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ-দৌল্লা। মীর জাফরের নেতৃত্বাধীন নবাবের অধিকাংশ সৈন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার ফলে অনিবার্য ভাবেই পতন হয় সিরাজের শাসনকালের।

মতিঝিলের সৌন্দর্য দেখেই ঈর্ষান্বিত সিরাজ তৈরি করেন হিরাঝিল। তবে এই কথা একবাক্যে স্বীকার করা যায় যে ভারতের শাসন ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পালাবদলের সাক্ষী এই মতিঝিল। এই প্রাঙ্গনকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ।

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদঃ-

ঘসেটি বেগমের মতিঝিল প্রাসাদ যদিও কালের প্রকোপে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে, কিন্তু সেই প্রাসাদকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বর্তমানে মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকে এটি কোম্পানি বাগ নামে পরিচিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন বিভাগের তত্ত্বাবধানে এই পার্কটি সুসজ্জিত হয়ে উঠেছে গোলাপ বাগান, পাতাবাহারি গাছ, মরশুমি ফুল, সবুজ ঘাসের নরম গালিচা এবং আরোও বিভিন্ন রকম গাছের সমারোহে। এছাড়াও সেখানে রয়েছে নবাবদের ও তাঁদের বংশের নানা মূর্তি, মিউজিক্যাল ফোয়ারা। রয়েছে আলো এবং শব্দের মাধ্যমে মুর্শিদাবাদের নানারকম ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা বিশেষ করে নবাব সিরাজ উদ-দৌল্লার পতনের ইতিবৃত্ত এখানে সুন্দর করে বর্ণনা করা হয়। সুদৃশ্য পাথর বিছানো রাস্তা চলে গেছে একেবেকে মতিঝিল পার্কের মধ্যে দিয়েই।

বাচ্চাদের জন্য রয়েছে দোলনা, সি-স, স্লিপার, টয়-ট্রেন, ড্রাগন ট্রেন সহ আরোও নানা রকম অ্যাডভেঞ্চার রাইড। পার্কের ভেতরে রয়েছে বেশ কিছু বিশ্রাম স্থল, পক্ষী আলোয়, ছবি তোলার জন্য সুদৃশ্য জায়গাও। সাইকেল, বিদ্যুৎ চালিত পরিবেশ বান্ধব গাড়ি রয়েছে, পর্যটকরা যা ভাড়া নিয়ে মতিঝিল পার্কের ভেতরে ঘুরতে পারেন। শীতকালে এই পার্কের লেকে পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে যায়। পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে সুদৃশ্য হোটেল ব্যবস্থা। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন বিভাগের নিজস্ব রিসর্ট আর হলিডে হোম এই পার্ক এর মধ্যেই অবস্থিত যা সুসজ্জিত বাগান এবং ফোয়ারা দ্বারা পরিবেষ্টিত। এছাড়া রয়েছে সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট মঞ্চ যার সংলগ্ম জমিতে ১০০ জন পর্যন্ত অতিথির স্থান সংকুলান সম্ভব। আরো ব্যবস্থার মধ্যে ১০০জনেরও বেশি পিকনিক করার স্থান, যে কোনো রকম গাড়ি স্বল্প অর্থের বিনিময়ে রাখার জায়গাও রয়েছে পার্কের মধ্যেই। পর্যটকদের জন্য মালপত্র রাখার জায়গাও আছে যেখানে প্রথম আগমনের সময়  অনুসারে স্বল্প মূল্যে ৬ ঘন্টা অবধি যেকোনো মালপত্র রাখা যায়।

কি করে যাবেনঃ-

মতিঝিল পার্ক মুর্শিদাবাদ থেকে মুর্শিদাবাদ রেল স্টেশনের দূরত্ব ২ কিমি এবং লালবাঘ কোর্ট রোড রেল স্টেশনের দূরত্ব ৩ কিমি। শিয়ালদহ বা কোলকাতা জংশন স্টেশন থেকে শিয়ালদহ-লালগোলা বিভাগের যে কোনো ট্রেন এ করে এই স্টেশন গুলিতে পৌছনো সম্ভব। শিয়ালদহ বা কোলকাতা জংশন স্টেশন থেকে দূরত্ব ১৯৭ কিমি।

নেতাজী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর মুর্শিদাবাদের সব থেকে নিকটতম বিমান বন্দর যার দূরত্ব পার্ক থেকে ২১০ কিমি।

এছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে বাস যাতায়াত করে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে। বাসে করে চার্চ মোড়ে, যার দূরত্ব পার্ক থেকে ১০কিমি অথবা বহরমপুরের পঞ্চাননতলা মোড়ে, যার দূরত্ব পার্ক থেকে ১৪কিমি নেমে বাকি পথ রিক্সা বা টাঙ্গা গাড়ি বা ট্যাক্সি করে যেতে হবে।

আরো পড়ুন : ইকো পর্যটন উপভোগের ১০টি কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ প্রেমীদের জন্য।

উপসংহারঃ-

এই মুর্শিদাবাদেই অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীন নবা্বী শাসনের সূর্য। শুরু হয় বাংলার বুকে ব্রিটিশরাজ। এই বাংলা থেকেই আবার জন্ম নিয়েছে একের পর এক বিপ্লবী। তাঁদের গৌরব গাঁথা অমলিন। রাজ্যের একাধিক স্থানে এরকমই অনেক ঐতিহাসিক সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে। বেশ কিছু নষ্ট হয়ে গেছে পরিচর্যার অভাবে। নাগরিক এবং সরকার দু’ তরফেরই উচিত এই সম্পদের প্রতি যত্নশীল হওয়া। ইকো পর্যটন করতে গিয়ে ঘোরার জায়গা এবং তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে দায়বদ্ধতা খুব দরকারী। যেখানে মর্জি নোংরা করা, থুতু ফেলা, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল ফেলার মতো কু-স্বভাব থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে।  পরিবেশ রক্ষা করার দায় আজ সমাজের প্রতিটি মানুষের। আজকে আমাদের পদক্ষেপের ফলেই এই বসুন্ধরা বাসযোগ্য হয়ে উঠবে আগামী প্রজন্মের জন্য

বি দ্রঃ বর্তমানে দেশের অনেক জায়গাতেই “কোভিড ১৯” এর জন্যে ভ্রমনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই ভ্রমণের আগে সরকারি নির্দেশ ও নিয়মাবলী মেনে চলাটাই বাঞ্চনীয় !

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Bengali Edition

গঙ্গার জলদূষণ রোধ করতে না পারলে আমাদের বিপদ আসন্ন

Published

on

গঙ্গার জলদূষণ
Image credit : Pixabay (TonW ))
Share This Article

ভারত ও বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক নদী হলে গঙ্গা। এটি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় নদী গঙ্গার উৎসস্থল ভারতের উওরাখন্ড রাজ‍্যের পশ্চিম হিমালয়ে। ইহার দৈর্ঘ‍্য 2525 কিমি। এই নদীটি প্রবাহিত হয়েছে দক্ষিণ ও পূর্বে গাঙ্গেয় সমভূমির উপর দিয়ে এবং অবশেষে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। বিশ্বের প্রথম 20 টি নদীর জলপ্রবাহের ক্ষমতা অনুযায়ী গঙ্গা একটি। এই গঙ্গা নদীই হল বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নদী অববাহিকা। যেখানে জনসংখ্যা 40 কোটি এবং জনঘনত্ব 1000 জন প্রতি বর্গমাইলে। গঙ্গা নদীর উপনদীগুলি হল- গোমতী, ঘর্ঘরা, কোশী, মহানন্দা, যুমনা, তমসা, শোন, দামোদর ইত্যাদি। গঙ্গা নদী যেসব নগর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সেগুলি হল- হরিদ্বার, কানপুর, এলাহাবাদ, বারাণসী, পাটনা, ফারাক্কা, মুর্শিদাবাদ, কলকাতা, হাওড়া ইত্যাদি। হিন্দুদের কাছে পবিত্র নদী হল গঙ্গা। দেবীজ্ঞানে এই নদীকে পূজা করা হয়। তবে এই নদীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সীমাহীন, বহু পূর্বতন প্রাদেশিক ও সাম্রাজিক রাজধানী এই নদীর তীরেই অবস্থিত। এই গঙ্গার জলদূষণ এত মাত্রায় বেড়েছে যে দূষণের দিক থেকে এই নদীর নাম প্রথমে উঠে এসেছে। গঙ্গাতীরে বসবাসকারী কয়েক কোটি ভারতীয়রাই যে শুধুমাত্র গঙ্গা দূষণ করছে তা নয়, 140 কোটি মাছের প্রজাতি, 90টি উভচর প্রানীর প্রজাতি, গাঙ্গেয় শুশুকরাও গঙ্গার ক্ষতি করছে। গঙ্গা অ‍্যাকশান প্লান নামে একটি পরিকল্পনা গৃহিত হয়েছিল গঙ্গা দূষণ রোধের জন্য। তবে এই প্রকল্প ব‍্যর্থ হয় কারণ দূর্ণীতি, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, সুষ্ঠ পরিবেশ পরিকল্পনার অভাব এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলির অসহযোগিতায়। কিন্তু বর্তমান সরকারের তৎপরতায় কিছুটা দূষণমুক্ত হয়েছে গঙ্গা নদী এবং এই আশা রাখা যায় যে ভবিষ্যতে এই নদী পুরোপুরি দূষণ মুক্ত হবে।

প্রবাহপথ:- ভাগীরথী ও অলকানন্দা নদীর সঙ্গমস্থল হলো মূল গঙ্গা নদীর উৎস স্থল। ভাগীরথীকেই গঙ্গার মূল প্রবাহ বলে মনে করা হয়। অনেকগুলি ছোট নদী গঙ্গা জলের উৎস। অলকানন্দা, ধৌলীগঙ্গা, নন্দকিনী, পিন্ডার, মন্দাকিনী ও ভাগীরথী হলো গঙ্গা নদীর ছটি দীর্ঘতম ধারা। অলকানন্দার উপর অবস্থিত পঞ্চপ্রয়াগ নামে পরিচিতি এই পাঁচটি সঙ্গমস্থল।এই পাঁচটি প্রাণীর নাম হল বিষ্ণুপ্রয়াগ, নন্দপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ রুদ্রপ্রয়াগ ,এবং সর্বশেষে দেবপ্রয়াগ। যেখানে মূল গঙ্গা নদীর জন্ম হয়েছে ভাগীরথী ও অলকানন্দা মিলনের ফলে।

আরো পড়ুন : প্লাস্টিক দূষণ :- কীভাবে শেষ করে দিচ্ছে সামুদ্রিক বাস্ততন্ত্র

গঙ্গা হৃষি কেশের কাছে হিমালয় ত্যাগ করে তীর্থ শহর হরিদ্বার গাঙ্গেয় সমভূমি তে পড়েছে। উত্তরপ্রদেশের দোয়াব অঞ্চলে জলসেচের জন্য হরিদ্বারে গঙ্গা খালের মাধ্যমে গঙ্গাজল পাঠানো হয়ে থাকে। এদিকে হরিদ্বারের আগে গঙ্গার মূলধারাটি সামান্য দক্ষিণ পশ্চিম মুখীহলেও হরিদ্দার পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে তাবাক নিয়েছে এরপর গঙ্গা একটি অর্ধ বৃত্তাকার পথে 800 কিলোমিটার কনৌজ ফারুকাবাদ ও কানপুর শহরের ধার দিয়ে পার হয়েছে। এলাহাবাদ থেকে পশ্চিমবঙ্গের মালদা পর্যন্ত বারানসি, পাটনা, মির্জাপুর, ভাগলপুর, সৈয়দপুর শহরের পাশ দিয়ে গঙ্গা প্রবাহিত হয়েছে। দক্ষিণ -দক্ষিণ পূর্ব দিকে ভাগলপুরে বইতে শুরু করেছে। গঙ্গার ঘর্ষণ ক্ষয় শুরু হয়েছে পাকুর এর কাছে। এরপর ভাগীরথী- হুগলির জন্ম যেটি গঙ্গার প্রথম শাখা নদী। এটি দক্ষিণবঙ্গে গিয়ে হয়েছে হুগলি নদী। হুগলি নদীতে ফারাক্কা বাঁধ গড়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশ সীমান্ত পেরোনোর কিছু আগে।এই বাঁধ হুগলি নদী কে আপেক্ষিকভাবে পলি মুক্ত রাখা হয়। হুগলি নদীর উৎপত্তি হয়েছে ভাগীরথী ও জলঙ্গী নদীর সঙ্গমের পর। দামোদর নদ হল এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উপনদী( দৈর্ঘ্য 541 কিমি )।সাগরদ্বীপের কাছে হুগলি নদী বঙ্গোপসাগরে মিশেছে ।গঙ্গার মূল শাখাটি বাংলাদেশ যমুনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত পদ্মা নামে পরিচিত ।গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র এর দ্বিতীয় বৃহত্তম শাখানদী আরও দক্ষিণে গিয়ে মেঘনার সাথে মিশে মেঘনা নামধারণ করে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে ।বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীর বদ্বীপ (আয়তন প্রায় 59,000 কিমি)।

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব:- সম্পূর্ণ গঙ্গা নদীটিই উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত আমাদের কাছে পবিত্র নদী। মানুষ গঙ্গাস্নান করাকে পুণ্যস্নান বলে বিবেচিত করে। গঙ্গার জলে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্য তর্পণ করা হয়। অনেক সময় দেখা যায় মানুষ মারা গেলে সেই মৃত ব‍্যক্তির অস্থি গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়। আবার ঘরোয়া ধর্মানুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য অনেকেই গঙ্গা স্নান সেরে ঘরে ফেরার সময়ও কিছু পরিমাণ গঙ্গাজল তুলে নিয়ে যায়।গঙ্গা নদী কে নিয়ে কিছু পৌরাণিক কাহিনীও আছে।

দূষণে বিপন্ন গঙ্গা : পশ্চিমবঙ্গে হুগলি নদী হল গঙ্গার একটি প্রধান শাখা নদী। সরকার চন্দননগর শহরে বর্জ‍্য ব‍্যবস্থাপনা প্ল‍্যান্ট গড়ে তুলেছিল গঙ্গার জল দূষণমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে। এই প্ল‍্যান্টটিকে ঘিরে তৈরী হয়েছে একটি পার্ক। যেখানে প্রতিদিন প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। যার ফলে গঙ্গার জল দূষিত হচ্ছে। এখন এই প্ল‍্যান্টটির দ্বারা মাত্র  10 শতাংশ বর্জ‍্য পরিশোধন করা হচ্ছে। গবেষণা করে জানা গেছে পশ্চিমবঙ্গে কয়েকশত শহর থেকে প্রতিদিন প্রায় 7 বিলিয়নেরও বেশি অপরিশোধিত বর্জ‍্য সরাসরি গঙ্গায় চলে যাচ্ছে। মানুষের অপরিশোধিত বর্জ‍্যই হল গঙ্গার  জলদূষণ-এর পিছনে সবচেয়ে বড়ো নিয়ামক। প্রায় 85 শতাংশ গঙ্গার জলদূষণের কারণ হচ্ছে মনুষ‍্য সৃষ্ট বর্জ‍‍্য এবং বাকি বর্জ‍্যপদার্থ আসে কারখানা থেকে, কৃষিতে ব‍্যবহৃত সার থেকে, মানব শরীর ও মৃত পশুপাখির দেহ থেকে। গঙ্গার জলে পরীক্ষা করে দেখা গেছে প্রতি 100 এমএল জলে 160000 পরিমাণ ব‍্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। অর্থাৎ গঙ্গার জলে মানুষের মলের উপস্থিতির মাত্রা অনেক বেশি। গঙ্গা নদীকে  পবিত্র নদী বলে মনে করা হয়। আর এই নদী এখন ভীষনভাবে দূষিত হচ্ছে। গঙ্গার জলদূষণ এখন রোজকার ঘটনা হয়ে গেছে। এমনকি গঙ্গার ধারে গড়ে ওঠা  তীর্থস্থানগুলি যেমন রিশিকেশ ও হরিদ্বারেও এই ধরনের জীবাণু পাওয়া গেছে।

গঙ্গা নদীর বড়ো সমস্যা হল এই নদীর জলের প্রবাহ এখন অত্যন্ত ক্ষীণ। গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে এমনটা অনেক পরিবেশকর্মীরা মনে করেন। তবে জলবিদ‍্যুৎ প্রকল্পের জন‍্য বাঁধ নির্মাণ করে এই স্বাভাবিক প্রবাহ ব‍্যাহত করা হচ্ছে। আরও দুশ্চিন্তার ব‍্যাপার হচ্ছে যে উওরাখণ্ডে নদীর উৎসমুখে গঙ্গোত্রী হিমবাহটি প্রতিবছর 20 মিটার করে সরে যাচ্ছে – এর ফলে জলের প্রবাহ কমে যাচ্ছে। তবে যাইহোক মানুষই পারে গঙ্গার জলদূষণ-কে রোধ করতে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার দূষণ সৃষ্টিকারী 95 টি কারখানা বন্ধ করেছে। এছাড়া উওরপ্রদেশেও প্রায়  94 টি কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। এতকিছুর পরেও খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি। কোলকাতা থেকে ভাগীরথি-হুগলির উজানে গেলে দেখা যাবে সেখানে নদীর তীরে অসংখ্য কলাবাগান, ইটভাটা ও কয়লা বিদ‍্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এখান থেকে প‍্রচুর বর্জ‍্যপদার্থ নদীতে মিশছে। ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘ ও পবিত্র নদী হল গঙ্গা। আর এই নদীর জলই প্রতিমুহুর্তে দূষিত হচ্ছে। গঙ্গার জল 1986 সালে শুদ্ধ করার প্রথম কাজ শুরু হয়েছিল। প্রথমে পরিকল্পনা অনুযায়ী যেসব নালা দূষিত জল নদীতে বয়ে আসত সেইসব নালাগুলির মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নদী তীরবর্তী বর্জ‍্য পরাশোধন কেন্দ্রে প্রবাহিত হয়ে তারপর পরিষ্কার করে নদীতে আবার ফিরিয়ে দেওয়া হত। দ্বিতীয় ধাপে তা বর্ধিত করে যমুনাসহ গঙ্গার অন্যান্য শাখা নদীগুলিতে এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়।

উপসংহার: আমাদের পবিত্র নদী গঙ্গাকে আমাদেরই দূষণ মুক্ত করে তুলতে হবে। গঙ্গার জল যাতে বিশুদ্ধ থাকে সেই দিকে সবসময়ই নজর দিতে হবে। শহরের নালার জল পরিশোধিত করে তা নদীতে ফিরিয়ে দিতে হবে। গঙ্গা দূষিত হলে আমাদের সমাজও দূষিত হবে। এছাড়া এই দূষিত জলের মাধ্যমে নানা রোগের জীবাণু ছড়িয়ে বহু মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রতি পাঁচ বছরে প্রায় কয়েক লাখ শিশু কেবল ডাইরিয়াতে মারা যায়। গবেষণা করে দেখা গেছে গঙ্গা নদীর অববাহিকার আশেপাশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে পরিপাকতন্ত্র, লিভার, চর্ম, কিডনি ও মূত্রনালীতে ক‍্যান্সারের প্রবণতা থাকে। তাই গঙ্গার জলদূষণ রোধ করতে না পারলে আমাদের পরিবেশ রোগাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। এখন কোনো বাধ‍্যবাধকতা ছাড়াই নদীর তীরে জনবসতি বেড়ে চলেছে এবং কল – কারখানা , বড় বড় রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। সরকারকে সেইদিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। নদীর দুপাশে প্লাবনভূমিকে মুক্ত রাখতে হবে। দেশের প্রত‍্যেকটা মানুষকেই পবিত্র নদী গঙ্গাকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য সচেতন করতে হবে। গঙ্গার জলদূষণ রোধ করতে পারলে আমরা মানুষরাই শুধু উপকৃত হব তা নয়, গঙ্গা নদীতে থাকা বিভিন্ন জীবজন্তুও উপকৃত হবে।

Continue Reading

Bengali Edition

আন্তর্জাতিক বায়ু পরিষ্কার দিবস : স্বচ্ছ নীল আকাশের জন্যই পালিত হচ্ছে

Published

on

আন্তর্জাতিক বায়ু পরিষ্কার দিবস
Image credit : Pixabay (Engin_Akyurt)
Share This Article

বায়ু কাকে বলে – আন্তর্জাতিক বায়ু পরিষ্কার দিবস  আলোচনা প্রসঙ্গে প্রথমেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে বায়ু কাকে বলে? পৃথিবীর চারপাশে ঘিরে থাকা স্তরকে বায়ুমণ্ডল বলা হয়। এই স্তর গুলি কে পৃথিবী তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তির দ্বারা ধরে রেখেছে। বায়ুমণ্ডলের ফালে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে আসতে পারে না। এই বায়ুমণ্ডলের জন্যই পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষা পায়। এই বায়ুমণ্ডলের জন্য ভূপৃষ্ঠ দিনের বেলায় উত্তপ্ত হয় এবং রাতের বেলায় দিনের থেকে কম ঠান্ডা অনুভূত হয়। শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করা এবং সালোকসংশ্লেষের জন্য কাজে আসে বায়ুমণ্ডল।  এই বায়ুমণ্ডলের গ্যাস গুলির মধ্যে অতি প্রচলিত নাম হল বায়ু। শুষ্ক বাতাসে ৭৮.০৯% নাইট্রোজেন,২০.৯৫% অক্সিজেন, ০.৯৩% আর্গন, ০.০৩% কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং সামান্য পরিমাণে অন্যান্য গ্যাস থাকে।বাতাসে এছাড়াও পরিবর্তনশীল পরিমাণ জলীয় বাষ্প রয়েছে যার গড় প্রায় ১%।বাতাসের পরিমাণ ও বায়ুমন্ডলীয় চাপ বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন রকম হয়,স্থলজ উদ্ভিদ ও স্থলজ প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত বাতাস কেবল পৃথিবীর ট্রপোমণ্ডল এবং কৃত্রিম বায়ুমণ্ডল সমূহে পাওয়া যাবে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সম্পর্কিত বিষয় যে গ্রন্থে আলোচিত হয় সেই গ্রন্থের নাম  আইরোলজি। 


আরো পড়ুন : পরিবেশ দূষণ বিশ্বজগতের মানব সভ্যতাকে বিঘ্নিত করছে !

কেন বায়ুদূষণ ঘটছে- শিল্প, যানবাহন, জনসংখ্য‌ার বৃদ্ধি এবং নগরায়নের  ফলে বিভিন্ন ক্ষতিকারক পদার্থ বাতাসে মিশে গিয়ে বায়ু দূষণ ঘটায়।  বায়ু দূষণের জন্য ক্ষতিকারক উপাদান গুলি হল- কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড,  সালফার ডাইঅক্সাইড, সাসপেনডেড পার্টিকুলার ম্য‌াটার, ওজোন, লেড বা সিসা, ক্লোরোফ্লুরোকার্বন।  বিভিন্ন ধরনের কাঠ,  সিগারেট, পেট্রোল, ডিজেল  অর্ধেক পোড়া তার থেকে যে রং ও গন্ধবিহীন গ্যাস উৎপন্ন হয় তা হলো কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস। এই গ্যাসটি আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে রক্তে অক্সিজেন গ্ৰহণের পরিমাণকে কমিয়ে দেয়। এই গ্যাসের প্রভাবে আমাদের প্রতিবর্ত ক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় সারাদিন প্রায় ঐ সমস্ত মানুষকে ঝিমানো অবস্থায় দেখা যায়। মানুষের নানা কার্যকলাপ থেকে নিঃসৃত হয় কার্বন-ডাই-অক্সাইড। কয়লা, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। রেফ্রিজারেটর এবং এয়ারকন্ডিশন থেকে নির্গত হয় ক্লোরোফ্লোরো কার্বন  উপাদানটি। এই গ্যাসটি ওজোন স্তরে  গিয়ে ওজোন স্তরকে পাতলা করে দেয়। ওজোন স্তর পাতলা হলে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মির জন্য  জীবজগৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লেড ব্য‌াটারি, পেট্রোল, ডিজেল, হেয়ারডাই, রঙ প্রভৃতি পণ্য থেকে পাওয়া যায় লেড সিসা। এটি শিশুদের হজম প্রক্রিয়া স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে। এছাড়াও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই উপাদানের ফলে শিশুদের ক্যান্সার হতে দেখা যায়।

আমরা সকলেই জানি পৃথিবীর ওজোন স্তরটি সূর্য রশ্মির ক্ষতিকারক উপাদান থেকে আমাদের প্রাণীকূলকে রক্ষা করছে সর্বদাই। কিন্তু এই গ্যাসটি যখন মাটির সংস্পর্শে আসে তখন তার কুপ্রভাব পড়ে এই প্রাণীগুলোর উপর। গ্যাস নির্গত হয় বিভিন্ন কলকারখানা ও যানবাহন থেকে। এই গ্যাসের প্রভাবে মানুষের ত্বকে অনেক সময় চুলকানি দেখা যায়। এছাড়াও ঠান্ডা লাগার প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে এই গ্যাসটি। এই গ্যাসের ফলে নিউমোনিয়া হওয়ার আশঙ্কা প্রবল পরিমাণে বেড়ে যায়। পেট্রোল, ডিজেল, কয়লা  থেকে নির্গত হয় নাইট্রোজেন অক্সাইড। এই গ্য‌াসের প্রভাবে ধোঁয়াশা তৈরি হয় এবং অ্য‌াসিড বৃষ্টি হয়। এই গ্যাসের কুপ্রভাবের ফলে শীতকালে বাচ্চাদের সর্দি কাশি হতে পারে। ধোঁয়া ধুলোর প্রভৃতি জিনিসগুলি একটা নির্দিষ্ট সময় জুড়ে বাতাসে ভেসে থাকে।  এই ভাসোমান কণাকে এসপিএম বলে। এই গ্যাসের কনা নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে যায় এবং শরীরের প্রধান অঙ্গগুলির ক্ষতিসাধন করে। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলোতে কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গত হয় সালফার ডাই অক্সাইড গ্যাস। বিভিন্ন শিল্পজাত প্রক্রিয়ার ফলে এই গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই গ্যাসের কুপ্রভাবের ধোঁয়াশা তৈরি ও এসিড বৃষ্টি হতে দেখা যায়। মানুষের শরীরে ফুসফুসের জটিল সমস্যাগুলোর জন্য দায়ী এই গ্যাসটি। 


বায়ু দূষণের কুপ্রভাব- বৈজ্ঞানিকরা বলেছেন বায়ু দূষণের ফলে আমাদের গড় আয়ু প্রায় তিন বছর করে কমে যায়। ধূমপান আমাদের শরীরে যতটা না ক্ষতি করতে পারে তার চেয়ে বহুগুণে ক্ষতি করে দূষিত বায়ু। কার্ডিওভাসকুলারের এক রিচার্জ জার্নালে বলা হয়েছে যুদ্ধ সহ বিভিন্ন সংঘাতের জন্য  মানুষের যে পরিমাণ আয়ু কমে তার দশগুণ আয়ু কমে বায়ু দূষণের জন্য। ২০১৫ সালে মানুষের গড় আয়ু ও মৃত্যুর হার  পর্যালোচনা করে দেখা যায় বায়ু দূষণের কবলে পড়ে সারা পৃথিবীতে প্রায় ৮৮ লক্ষ মানুষ মারা যায়। 


বায়ু দূষণ রোধ করার ব্যবস্থা- বায়ুকে দূষণের হাত থেকে বাঁচাতে গেলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো আমাদের অনুশীলন করা প্রয়োজন –

১) কলকারখানার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যালের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। 

২) প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হওয়া যাবেনা। স্বল্পসংখ্যক গাড়ি যদি রাস্তায় চলাচল করে তাহলে গাড়ি থেকে যে বিষাক্ত ধোঁয়া বেরিয়ে বায়ুতে মিশে যায় তার পরিমাণ কমবে। বেশ কয়েক দিন অন্তর অন্তর ই গাড়ির ধোঁয়া পরীক্ষা করানো উচিত।

 ৩) যত্রতত্র নোংরা আবর্জনা ফেলু জন্য পতিতা রাস্তার মোড়ে নির্দিষ্ট একটি ডাস্টবিন রেখে সেখানে নোংরা ফেলাই ভালো। কারণ আবর্জনা থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে বায়ুকে দূষণযুক্ত করে তোলে।

পরিবেশকে রক্ষা  করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে দিনটি গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়ে থাকে। বায়ুদূষণ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়াতে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের প্রচারের জন্য ৭ ই সেপ্টেম্বর দিনটিকে আন্তর্জাতিক বায়ু পরিষ্কার দিবস হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। ২০২০ সালের ১৭ ই সেপ্টেম্বর প্রথম আন্তর্জাতিক বায়ু পরিষ্কার দিবস পালন করা হবে। 


আন্তর্জাতিক বায়ু পরিষ্কার দিবসটি কী- বায়ু দূষণের হাত থেকে রক্ষার প্রয়োজনীয় কর্মসূচি প্রচারের জন্য  আন্তর্জাতিক  বায়ু পরিষ্কার দিবস এই দিনটিকে পালন করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। 


আন্তর্জাতিক বায়ু পরিষ্কার দিবসটি পালনের প্রয়োজনীয়তা কী? স্টেট অফ গ্লোবাল এয়ার’ সংস্থার প্রতিবেদন থেকে উঠে এসেছে এশিয়া মহাদেশের বসবাসকারী বিভিন্ন দেশের অধিবাসীদের মধ্যে প্রায় 90% মানুষ বসবাস করে বায়ু দূষণে।  সবচেয়ে বাংলাদেশের অধিবাসী কোন বায়ু দূষণের মধ্যে বসবাস বেশি করে। আর এই বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ আর ভারত ও চীনে ১২ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। এছাড়াও ওই সংস্থার প্রতিবেদনে ধরা পড়েছে ২০১৭ সালের হিসাবে প্রতি ১০জনের মধ্যে একজন বায়ুদূষণের কারণেএওমারা যাচ্ছে। চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রের বেশি মানুষের বায়ু দূষণের ফলে মৃত্যু ঘটেছে।  এরমধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। সড়ক দুর্ঘটনা থেকে ধূমপান প্রভৃতি কারণে যেসব মানুষের মৃত্যু ঘটে ওই সব মানুষের সংখ্যা থেকে বায়ু দূষণের কারণে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে ২০১৭ সালে। দূষণ জনিত কারণে মধ্য এশিয়ার দেশ গুলির অবস্থা আরও সঙ্কটজনক। এই দেশের শিশুদের  ত্রিশ মাস করে আয়ু কমে গেছে বায়ু দূষণের কারণে।  তাই অবিলম্বে প্রয়োজন বায়ুদূষণ কে বন্ধ করা। বায়ু দূষণ বন্ধ করার জন্য 2019 সালের 17 ই সেপ্টেম্বর কে বেছে নেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক বায়ু পরিষ্কার দিবস হিসাবে । আন্তর্জাতিক বায়ু পরিষ্কার দিবসে বায়ু দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য কী কী কর্মসূচি আমাদের গ্রহণ করতে হবে সেই গুলি সম্পর্কে মানুষকে অবগত করার জন্যই এই দিনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। 

উপসংহার- পরিশেষে বলতে পারি আন্তর্জাতিক বায়ু পরিষ্কার দিবস এর কর্মসূচি একটা খুবই ভালো পদক্ষেপ আমাদের বিশ্ববাসীর জন্য। আমার আমরা বিশ্ব বাসীরা আজ দূষণ যুক্ত পরিবেশে বাস করছি। এই দূষণের ফলে আমাদের শ্বাসজনিত নানা অসুখ থেকে ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক বায়ু পরিষ্কার দিবস পালনের মাধ্যমে যদি বিশ্ববাসীকে বায়ু দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাবার নিয়ম গুলি অবগত করানো যায় তাহলে হয়তো এই বায়ু দূষণের হাত থেকে আমাদের প্রকৃতি মা রক্ষা পাবে। বায়ু দূষণ মুক্ত হলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এক স্বচ্ছ নীল আকাশ কে দেখবে।

Continue Reading

Bengali Edition

সবুজ আর নীলের সমারোহে বাঁশখালি ইকোপার্ক

Published

on

বাঁশখালি ইকোপার্ক
Image Credit : Wikipedia (Sakibul Alam Bhuian)
Share This Article

ট্টগ্রাম মানেই ছোটোবড়ো পাহাড় আর ঝর্ণা, তার সাথে আছে জীববৈচিত্র্য! আর এই সবকিছুর মিশেল বাঁশখালি ইকোপার্ক! জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল উন্নয়ন, ইকোট্যুরিজম ও চিত্তবিনোদন-এই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে ১০০০ হেক্টর জমির উপর ২০০৩ সালে স্থাপিত হয় এই ইকোপার্কটি। যদিও ইকোপার্কের বয়স অন্যান্য ইকোপার্কগুলোর তুলনায় ঢের কম, এর প্রাচুর্য ও সুযোগ-সুবিধা দর্শনার্থীদের সেই আক্ষেপ একেবারেই কমিয়ে দেবে। পুরো ইকোপার্ক জুড়ে রয়েছে উঁচু-নিচু পাহাড়ী অঞ্চল, লেকের স্বচ্ছ পানি ও নানান জাতের গাছের মিশেলে বনাঞ্চল। 

চারপাশে সবুজের সমারোহ, বন্যহাতির বিচরণ, চেনা-অচেনা নানান পাখির কলকাকলি, দেশের সর্বোচ্চ ঝুলন্ত সেতু, সুবিশাল লেক, সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার, রেস্টহাউজ, চিড়িয়াখানা, রিফ্রেশমেন্ট কর্নার এসবকিছু মিলে বাঁশখালী ইকোপার্ক দেশীয় ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অন্যতম একটি জায়গা! 


আরো পড়ুন :
বন্যপ্রানী অভয়ারণ্য : বাংলাদেশের দশটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য

বাঁশখালী ইকোপার্কের আদ্যোপান্ত 

চট্টগ্রাম জেলা শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বাঁশখালী ইকোপার্ক পৃথিবীর বুকে ছোট্টো এক টুকরো স্বর্গ বলা যেতে পারে! এর মধ্যে কি কি আছে সেই বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে ছোট্টো করে বরং কিছু সাংখ্যিক হিসেব জেনে নেওয়া যাক এই ছোট্টো স্বর্গ সম্পর্কে! 

বাঁশখালী ইকোপার্ক 

স্থাপিতঃ ২০০৩ সাল 

আয়তনঃ ১০০০ হেক্টর 

জেলাঃ চট্টগ্রাম 

উপজেলাঃ বাঁশখালী 

উদ্ভিদবৈচিত্র্যঃ ৩১০ প্রজাতি 

লেকঃ ২ টি 

ঝুলন্ত ব্রিজঃ ২ টি 

পর্যটন সুব্যবস্থাঃ রেস্টহাউজ, ভিআইপি হোটেল, কটেজ, চিড়িয়াখানা 

বাঁশখালী ইকোপার্কটি মূলত ‘জলদি’ অভয়ারণ্য রেঞ্জের জলদি ব্লকে অবস্থিত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী ও বনজ সম্পদ রক্ষার জন্য আশির দশকের শেষদিকে বাংলাদেশ সরকার চুনাতি অভয়ারণ্য তৈরির ঘোষণা দেয়, সালটা ছিল ১৯৮৬। প্রায় সাড়ে সাত হাজার হেক্টরের বেশি আয়তনের এই অভয়ারণ্যটি ক্রমেই পশুপাখির জন্য একটি স্বস্তির স্থল হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে প্রশাসন এখানে ডানের ছড়া ও বামের ছড়া নামে দুইটি প্রকল্প এই অভয়ারণ্যের আওতায় নিয়ে আসে। 

পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালের দিকে স্থানীয় জনপ্রকৌশন অফিস থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয় পাহাড়ের ঢালুতে বাঁধ কেটে ডানের ছড়া ও বামের ছড়ার প্রায় ৮০ হেক্টরের মতোন জায়গা ফসলি জমির আওতাভুক্ত করার জন্য। এভাবেই মূলত শতাব্দী শেষ হলো। এরপর স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের তদবিরে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এখানে ইকোপার্ক করার ঘোষণা দেয়, ২০০৩ সাল থেকে এই পার্ক তৈরির কাজ শুরু হয়। 

বাঁশখালী ইকোপার্ক সারাবছরই তার নানাবিধ রূপ নিয়ে পর্যটকদের মন ভুলিয়ে আসছে, কিন্তু শীতকাল এলেই যেন সেই মাত্রাটা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ সময় সাইবেরিয়ার হিমপ্রবাহ থেকে বাঁচার জন্য যেসব অতিথি পাখিরা বাংলাদেশে আসে তাদের বেশিরভাগই আশ্রয় নেয় দক্ষিন চট্টগ্রামের এই ইকোপার্কে। সারাদিন পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকে লেকপ্রাঙ্গণ, বনাঞ্চল ও কটেজগুলো! যার দরুণ শীত এলে এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যাও বেড়ে যায়! 

বাঁশখালীর জীববৈচিত্র্য 

প্রথমেই বলে রাখা ভালো অন্যান্য ইকোপার্কের চেয়ে এই ইকোপার্কের স্বকীয়তা হচ্ছে এর সুব্যবস্থাপনা। এখানে বিচরণ করতে থাকা প্রায় কয়েক হাজার বন্য প্রাণী ও বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভির সম্পর্কে জানতে এখানে বন বিভাগ থেকে ২০১১ সালের ২১ আগস্ট প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয় তথ্য ও শিক্ষাকেন্দ্র; যেখানে কিনা এই সমস্ত প্রজাতি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান অর্জন করতে পারবে এখানে শিক্ষাসফরে আসা শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা। 

পার্কজুড়ে প্রায় ৩১০ প্রজাতির উদ্ভিদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, এর মধ্যে ১৮ প্রজাতির দীর্ঘ বৃক্ষ, ১২ প্রজাতির মাঝারি বৃক্ষ, ১৬ প্রজাতির অর্কিড ও এপিফাইট এবং ঘাস রয়েছে। ইকোপার্কে প্রায় ৫০ হেক্টর জমিজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ঝাউ বাগান এবং এর সাথে লাগোয়া ২০ হেক্টর জমিতে রয়েছে ভেষজ উদ্ভিদের বাগান। এছাড়াও পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য ১২ হেক্টর জমিতে রয়েছে শোভা বর্ধনকারী ফুল ও বাহারী গাছ। পার্ক এলাকার ৬৭৪ হেক্টর বনভূমি জুড়েই তৈরি করা হয়েছে মনোমুগ্ধকর বাগান! গর্জন, গুটগুটিয়া, বৈলাম, সিভিট, চম্পাফুল ইত্যাদি এই বাগানের সিগনেচার গাছ বলা যেতে পারে! 

এছাড়াও এখানে আছে মায়া হরিণ, চিত্রা হরিণ, চিত্রা বিড়াল, মেছো বাঘ, বাঘ ও জলজ পাখির প্রজনন কেন্দ্র! পার্কে প্রায় ৮৫ প্রজাতির পাখি, ৪৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৭ প্রজাতির উভচর রয়েছে। তবে বাঁশখালীর সবচেয়ে বড়ো সৌন্দর্য হচ্ছে শীতকালে সাইবেরিয়ান পাখির আনাগোনার সময়টা, এসময় একদিকে লেকে চাষ করা হয় বোরো ধান। অন্যদিকে উপরে উপরে থাকে শ’য়ে শ’য়ে পাখি! নিচে সবুজ, একদম উপরে আকাশ, দুইয়ের মাঝে ডানা মেলে নিশ্চিন্তে ওড়া পাখি! দর্শনার্থীরা তাই শীতকালে কোনভাবেই মিস করেন এই ইকোপার্ক ভ্রমণ!

 একইসাথে উদ্ভিদ ও প্রাণীর এমন সমাবেশ, তার উপর দৃষ্টিনন্দন লেক এবং ঝুলন্ত ব্রিজ! শুধুমাত্র দর্শনার্থী নয়, সংস্কৃতিকর্মী বিশেষত চলচ্চিত্র কর্মীদের জন্যও বর্তমানে এটি একটি আকর্ষণীয় ও আদরণীয় স্থান! দেশের মধ্যেই এমন ভিউ পেলে কেউ কেনো টাকা খরচ করে বাইরে যেতে চাইবে? 

ঝুলন্ত ব্রিজ ও অন্যান্য স্থাপনা 

ঝুলন্ত ব্রিজ

আরণ্যক সৌন্দর্যের এক অনন্য সংজ্ঞায়ন এই বাঁশখালী ইকোপার্ক, সমুদ্রের তট এর সাথে এসে মিলেছে। এখানে আছে বাংলাদেশের মধ্যে বিরল স্বছ পানির লেক। পার্কের সরু প্রবেশপথ বেয়ে কিছুদূর এগোলেই চোখে পড়বে নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে ঘেরা দু’টি লেক! একটির নাম বামের ছড়া, অন্যটি ডানের ছড়া। লেকের এপার থেকে ওপারে যাওয়ার জন্য কাঠের পাটাতন ও বাঁশ দিয়ে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সেতু! এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে এটিই বাংলাদেশের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু! কাঠের পাটাতনে নির্মিত এই সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২২ মিটার বা ৪০০ ফুট! ২০০৪ সালে সেতুটি তৈরী করা হয় এবং এর ধারণক্ষমতা ২৫ জন। 

সেতুর চারদিক দিয়ে পর্যটকদের জন্য সাজিয়ে রাখা রয়েছে আরো হাজারো বিস্ময়! 

পুরো ইকোপার্ককে আদ্যোপান্ত দেখার জন্য রয়েছে সুউচ্চ তিনটি ওয়াচ টাওয়ার। এই ওয়াচ টাওয়ারগুলোর উপরে উঠে কোন দূরবীন ছাড়াই কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের ঢেউ সৈকতের উপর আছড়ে পড়তে দেখবেন! সাথে চোখে পড়বে কুতুবদিয়া চ্যানেল, বঙ্গোপসাগর, চুনতি অভয়ারণ্যের নানান বিস্তীর্ণ দৃশ্য!
বামের ছড়া আর ডানের ছড়া যে শুধু আপনাকে চোখের সৌন্দর্য দেবে এমনটি কিন্তু নয়! বরং এখানে রয়েছে লেকের পারে বসে মাছ ধরার সুব্যবস্থাও! তাই আপনি একটি পড়ন্ত বিকেলে লেকের পারে বসে মাছ ধরবেন নাকি ওয়াচ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে সমুদ্রতটে সূর্যাস্ত দেখবেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া আপনার জন্য একটু কঠিন বটে! 

তবে পিকনিক স্পট বা থাকার জায়গা হিসেবেও বাঁশখালী ইকোপার্ক খুব একটা খারাপ না। এখানে আছে ভিআইপি হোটেল ‘ঐরাবত’, পিকনিক স্পট, কটেজ! এছাড়াও আছে সাসপেনশন ব্রিজ, দোলনা, স্লিপার, দ্বিতল রেস্ট হাউজ, ভাসমান প্ল্যাটফর্ম, রিফ্রেশমেন্ট কর্নার, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ব্যারাক, পাখি ও বন্যপ্রাণী অবলোকন টাওয়ার! সাথে আছে হ্রদের পানিতে স্পিডবোট ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে হ্রদে ভ্রমণের সুবিধা! তাই একদিনে যদি আপনি হ্রদের পুরো সৌন্দর্য অবলোকন করতে না পারেন সহজলভ্য দামে থেকে যেতে পারেন এখানকারই কোন একটা রেস্টহাউজে!  

প্রতি বছর সরকার থেকে প্রায় ৬/৭ লাখ টাকা দিয়ে এই হ্রদগুলোকে ইজারা দেওয়া হয় এবং এই হ্রদের পানি ব্যবহার করে বোরো মৌসুমে কৃষকেরা বোরো ধান চাষ করেন। এর সাথে দ্বিতীয় দফায় একনেক থেকে এই ইকোপার্কের উন্নয়নসাধনের জন্য আরো প্রায় ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। তাই অচিরেই বাঁশখালী ইকোপার্ক একটি জাতীয় পর্যটন কেন্দ্র হয়ে যেতে পারে এটি এখন আর বিস্ময় নয় একেবারেই! 

কীভাবে যাবেন?  

ঢাকা থেকে সড়ক, রেল বা আকাশপথে চট্টগ্রামে আসার সুব্যবস্থা রয়েছে। পছন্দ ও সাধ্যমতো যেকোনোটিতে চড়ে চট্টগ্রাম সদরে আসার পর আপনার প্রথম গন্তব্য বাঁশখালী। চট্টগ্রাম সদর থেকে বহদ্দারঘাট বাস টার্নিমাল থেকে বাহাত্তুরপুল বা নতুন ব্রিজ থেকে চট্টগ্রাম-বাঁশখালী বাসে চড়ে দুই থেকে আড়াই ঘন্টায় পৌঁছে যেতে পারেন বাঁশখালী। ভাড়া পড়বে ৪০-৪৫ টাকা। সিএনজি-ও নিতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুনতে হবে ২০০-২৫০টাকা। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা যোগে ইকোপার্কে! 

বাঁশখালী ইকোপার্ক শুধুমাত্র যে চট্টগ্রাম জেলার জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে তা নয়, বরং অচিরেই হয়তো এই ইকোপার্ক হয়ে উঠবে জাতীয় পর্যটনের নতুন দিগন্ত! 

বি দ্রঃ বর্তমানে দেশের অনেক জায়গাতেই “কোভিড ১৯” এর জন্যে ভ্রমনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই ভ্রমণের আগে সরকারি নির্দেশ ও নিয়মাবলী মেনে চলাটাই বাঞ্চনীয় ! 

Continue Reading

Trending